সারাদেশে কিশোর গ্যাং দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক অভিযানেও পাড়া-মহল্লায় অপরাধীদের দৌরাত্ম্য কমানো যাচ্ছে না। গত সেপ্টেম্বর থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত দেড় মাসের অভিযানে এক হাজার ৫০০ জনেরও বেশি কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক গ্রেপ্তারের ফলে দেশটির শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি বন্দি অবস্থান করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পুলিশি ধরপাকড় দিয়ে এই সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নয়।

কারাগার ও সংশোধনাগার সূত্রে জানা গেছে, রাজবাড়ী, যশোর ও গাজীপুরের কেন্দ্রগুলোতে বন্দি ধারণক্ষমতার উপচে পড়া চাপ তৈরি হয়েছে। গাজীপুরের টঙ্গীতে অবস্থিত দেশের প্রধান শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে মাত্র ৩০০ জনের জায়গা থাকলেও সেখানে বর্তমানে ৬৯৩ জন বন্দি রাখা হয়েছে। একইভাবে যশোরের পুলেরহাট শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে ১৫০ জনের ধারণক্ষমতার বিপরীতে রয়েছে ৩০৩ জন বন্দি। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত এই বন্দি সামলাতে চরম হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

পুলিশের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার বস্তিকেন্দ্রিক ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। পুলিশের খাতায় মোহাম্মদপুর, উত্তরা, টঙ্গী, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় অন্তত দেড় শতাধিক কিশোর অপরাধী গ্রুপের নাম নথিভুক্ত রয়েছে। এসব গ্যাংয়ে যুক্ত সদস্য সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার এবং দিন দিন এই সংখ্যা আরও বাড়ছে। এসব কিশোরদের বড় একটি অংশ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত কিংবা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। এর বাইরে ফেসবুকে ও টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারও উঠতি বয়সিদের গ্যাং সংস্কৃতিতে টেনে আনছে।

গ্যাং সংস্কৃতি বিস্তারের পেছনের কারণ বিশ্লেষণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক জানান, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণের মূল জায়গাগুলোতে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। স্থানীয় রাজনৈতিকভাবে পরিচিত কতিপয় প্রভাবশালীর ছত্রছায়ায় এলাকায় এসব গ্যাং গড়ে ওঠে। কিন্তু পেছনের এসব মদদদাতা বা 'বড় ভাইদের' আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না। তিনি উল্লেখ করেন, অপরাধে জড়ানো কিশোরদের বড় অংশই প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবার থেকে উঠে আসা। বেকারত্ব, শিক্ষার অভাব এবং মাদকের সহজলভ্যতার মতো সামাজিক সংকট বহাল রেখে কেবল বলপ্রয়োগ করে কিশোর গ্যাং দমন অসম্ভব।

কিশোর অপরাধীদের মনস্তাত্ত্বিক দিক নিয়ে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচার-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, বয়ঃসন্ধিকালে উঠতি বয়সিরা প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ থাকে এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ দ্বারা সহজে প্রভাবিত হয়। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বা মহল্লার বড় ভাইদের ক্ষমতা প্রদর্শন দেখে তারাও ক্ষমতা দেখাতে চায়। অপরাধচক্র ও রাজনৈতিক সুবিধাবাদীরা কিশোরদের এই মানসিকতার সুযোগ নেয়। ফলে কিশোররা অজান্তেই এসব গ্যাং ও মাদকের সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়ে। এছাড়া হতাশা, হুজুগ ও বেকারত্ব থেকেও অনেকে অপরাধে অংশ নেয়।

বিদ্যমান আইনের একটি সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে ওই বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা বলেন, প্রচলিত আইনে ১৮ বছরের কম বয়সিদের শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়। এর ফলে ১৬ বা ১৭ বছর বয়সি কিশোররা আগ্নেয়াস্ত্র বা মাদকের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত হলেও শিশু আইনের আওতায় তাদের দ্রুত জামিন দিতে হয়, যা নিয়ন্ত্রণে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

এদিকে সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা মনে করেন, কিশোর অপরাধ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই বিদ্যমান। তবে কেবল পুলিশের ওপর নির্ভর করে এই সংকট মোকাবিলা করা যাবে না। পুলিশি তৎপরতার পাশাপাশি সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগ নিতে হবে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কিশোর গ্যাং সমস্যা সমাধানের মূল চাবিকাঠি পরিবারের হাতেই রয়েছে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে এবং কার সঙ্গে মেলামেশা করছে, সে বিষয়ে পরিবারকে সচেতন ও তদারকি জোরদার করতে হবে।