সাতক্ষীরার উপকূলীয় শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন খাগড়াঘাট ও কৈখালী গ্রামে সুপেয় পানির সংকট নিরসনে দুটি আধুনিক রিভার্স অসমোসিস (RO) পানি শোধনাগার স্থাপন করা হয়েছে। বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আবুল খায়ের গ্রুপের অর্থায়নে নির্মিত এই প্ল্যান্ট দুটি চালুর মাধ্যমে স্থানীয় হাজারো অধিবাসী লোনা পানির দীর্ঘদিনের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেলেন। শনিবার দুপুরে এলাকা দুটিতে উপস্থিত থেকে নতুন এই সুপেয় পানি শোধনাগার দুটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন আবুল খায়ের গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শাবাব আহমেদ।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে শাবাব আহমেদ বলেন, উপকূলীয় এলাকার সাধারণ মানুষের সুপেয় পানির অভাব ও মানবিক কষ্ট তাদের গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। শুধু ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ না থেকে সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবেই মানুষজনের পাশে দাঁড়ানোর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর আগে করোনা মহামারীর সময় বিনামূল্যে অক্সিজেন সরবরাহের কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা এই উপকূলীয় জনপদে মানুষের সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর জীবন নিশ্চিত করতেই দীর্ঘস্থায়ী এই সমাধান আনা হয়েছে।

প্রকল্প সূত্র জানায়, সুন্দরবনঘেঁষা এই এলাকায় চারিদিকে জলরাশি থাকলেও পানের উপযোগী সুপেয় পানির তীব্র সংকট ছিল। বিশেষ করে ২০০৭ সালের প্রলয়ঙ্করী সিডর এবং ২০০৯ সালের আইলার পর মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানি পুরোপুরি পানের অযোগ্য হয়ে পড়ে। মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ত পানি পানের কারণে এখানকার বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে পেটের পীড়া, চর্মরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি জটিলতার মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভুগছিলেন। পরিবারের জন্য খাবার পানি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নারী ও শিশুদের মাইলের পর মাইল হাঁটতে হতো, যার ধাক্কায় অনেক বালিকাই নিয়মিত স্কুলে যাওয়া বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল।

নবনির্মিত প্ল্যান্ট দুটিতে পরিবেশবান্ধব ও অপচয়হীন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি গ্রাহককে ঢাকা ওয়াসার মতো বিশেষ ডিজিটাল কার্ড দেওয়া হয়েছে, যা পাম্পে স্পর্শ করলেই পানি পড়ে এবং সরিয়ে নিলে সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণ ও অসচ্ছল মানুষের সাধ্যের কথা চিন্তা করে এই সেবা পুরোপুরি ক্যাশলেস রাখা হয়েছে। প্রতি লিটার পানির পরিচালন খরচ ধরা হয়েছে মাত্র ৫০ পয়সা, যা স্থানীয় বাজারদরের চেয়ে অত্যন্ত সাশ্রয়ী। এ ছাড়া পল্লী বিদ্যুতের লোডশেডিং বা বিভ্রাটের ওপর নির্ভরতা কমাতে প্রতিটি শোধনাগারে ১০টি করে সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে, যাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে পানি সরবরাহ নিশ্চিত থাকে।

শোধনাগার দুটির সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে ‘খান ট্রেডার্স’ এবং স্থানীয় তরুণদের সামাজিক সংগঠন ‘শরুব ইয়ুথ ক্লাব’। এতে এলাকার যুবসমাজের জন্য স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। পানি প্ল্যান্ট উদ্বোধনের মাধ্যমে ঘরের দুয়ারে নিরাপদ পানি পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন এলাকার সাধারণ বাসিন্দারা। জমি দান করে প্রকল্পের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়া নূর উদ্দীন সরদার জানান, আগে বিষাক্ত লোনা ও লালচে আয়রনযুক্ত পানি পান করতে হতো, যা এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। খাগড়াঘাটের রহিমা বেগম ও কৈখালীর আমেনা খাতুন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, আগে বছরে কেবল দুই-তিন মাস বৃষ্টির পানি পেতেন, আর বাকি সময় বহুদূর হেঁটে লোনা পানি এনে তৃষ্ণা মেটাতে হতো। এবার কলের মুখেই তাজা মিষ্টি পানি পাওয়ার সুযোগে তাদের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসবে।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন আবুল খায়ের গ্রুপের সিআর প্রধান ফেরদৌস ফয়সাল, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বারসিক-এর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শাহিন ইসলাম, শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি সামিউল আজম মনির, স্থানীয় সমাজসেবক মহিউদ্দীন সরদার ও তাজ উদ্দীন আহমেদ। পুরো অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন যুব সংগঠন ‘শরুব ইয়ুথ টিম’-এর সভাপতি জান্নাতুন নাইম। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই প্রকল্প দুটি উপকূলীয় মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও স্বাবলম্বিতা অর্জনে বড় মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।