বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সাফিকুর রহমানের বাসায় ১১ বছর বয়সী এক গৃহকর্মীকে অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় পুলিশ আদালতে যে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে, তাতে নির্যাতনের ভয়াবহ বর্ণনা উঠে এসেছে। গত ৩১ আগস্ট উত্তরা-পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রোবেল মিয়া ঢাকার আদালতে এই অভিযোগপত্র জমা দেন, যা আদালত গ্রহণ করেছেন। মামলাটি এখন বিচারের জন্য ঢাকার সপ্তম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক সোহেল রানার কাছে পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগপত্রে সাফিকুর রহমান, তাঁর স্ত্রী বীথি আক্তার এবং বাসার দুই গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমকে আসামি করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা ও এসআই রোবেল মিয়া প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়ায় অভিযোগপত্রে তা তুলে ধরা হয়েছে এবং দুই আসামি আদালতে জবানবন্দিতে নির্যাতনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
ভুক্তভোগী শিশুটির জবানবন্দি অনুযায়ী, আট মাস ধরে সে ওই বাসায় এমডির বাচ্চার দেখাশোনার কাজ করত। কিন্তু বাসায় যাওয়ার পর থেকেই গৃহকর্ত্রী বীথি আক্তার তাকে মারধর করতেন। শিশুটির ভাষ্যমতে, তাকে বাথরুমে আটকে রাখা হতো, গলায় গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো, চোখে মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে দেওয়া হতো এবং পুতা বা নোড়া দিয়ে তার দাঁত ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। বাঁচার জন্য সে বাথরুমের পানি ও টুথপেস্ট খেয়ে বেঁচে ছিল। এছাড়া তার বাবা যখন তাকে দেখতে আসতেন, তখন নির্যাতনের চিহ্ন আড়াল করার জন্য তাকে বড় পোশাক পরানো হতো।
গত বছরের জুন মাসে হোটেলকর্মী বাবা তার মেয়েকে ওই বাসায় কাজে পাঠিয়েছিলেন। সর্বশেষ গত বছরের ২ নভেম্বর বাবা তার মেয়ের সঙ্গে দেখা করেন, এরপর আর দেখা করতে দেওয়া হয়নি। গত ৩১ জানুয়ারি সাফিকুরের স্ত্রী বীথি আক্তার ফোন করে শিশুটির অসুস্থতার কথা জানান। বাবা তাকে আনতে গিয়ে শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন দেখে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন এবং পরদিন মামলা দায়ের করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা তাঁর প্রতিবেদনে সাফিকুর রহমানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ এনেছেন। এতে বলা হয়, স্ত্রী দিনের পর দিন নির্যাতন চালালেও সাফিকুর তা দেখেও না দেখার ভান করেছেন, তাই স্ত্রীর অপরাধের দায় তিনি এড়াতে পারেন না। তবে সাফিকুর রহমানের আইনজীবী আরিফুর রহমান দাবি করেছেন, সাফিকুর কখনো শিশুটিকে মারেননি এবং তিনি মামলার বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হবেন।
বর্তমানে সাফিকুর রহমান ও গৃহকর্মী রুপালী খাতুন জামিনে থাকলেও বীথি আক্তার ও সুফিয়া বেগম কারাগারে রয়েছেন। বীথি আক্তার গত ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইসমাইলের কাছে জবানবন্দিতে তিন-চার দিন মারধরের কথা স্বীকার করলেও ভয়াবহ নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেন। অন্যদিকে গৃহকর্মী সুফিয়া বেগম জবানবন্দিতে জানান, বীথি আক্তার তাকে দিয়ে খুন্তি গরম করিয়ে নিয়ে নিজেই শিশুটির পায়ে ছ্যাঁকা দিয়েছিলেন। শিশুটির বাবা গোলাম মোস্তফা জানান, তার মেয়ে এখন চোখে কম দেখে এবং টাকার অভাবে তার চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন।
পরদিন ১ ফেব্রুয়ারি শিশুটির বাবা তাঁর সন্তানকে নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন।মামলায় সাফিকুর রহমান, তাঁর স্ত্রী বীথি আক্তার এবং বাসার অন্য দুই গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমের বিরুদ্ধে মামলা করেন।মামলার এজাহার ও শিশুটির স্বজন সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরে সাফিকুর রহমানের বাসার ছোট শিশুদের দেখাশোনা
সাফিকুরের স্ত্রী বীথি আক্তার এবং আরেক গৃহকর্মী সুফিয়া বেগম কারাগারে রয়েছেন।নির্যাতনের শিকার শিশুটি গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তারের আদালতে জবানবন্দি দেয়।