রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার বাসিন্দা মো. আলী হাসান সোহেল বর্তমানে রাশিয়ার পেনজা শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনিসহ ৩০ জনের ১৫ জনের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। মস্কো থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরের এই হাসপাতালে তিনি গত ১ মাস ১০ দিন ধরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ভিডিও কলে তিনি জানান, এ জীবন আর চান না তিনি। সুস্থ হলে আবারও যুদ্ধে পাঠানোর আশঙ্কায় তিনি আতঙ্কিত। তার ভাষ্যমতে, সুস্থ হওয়ার পর দেশে ফিরতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তিনি চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। তিনি আকুতি জানিয়ে বলেন, যেভাবেই হোক তাকে যেন পরিবারের কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
গত ৭ মে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে রাশিয়ায় যান ৩০ জন বাংলাদেশি। তাঁদের পরিবার জানিয়েছে, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুত চাকরি না দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে তাঁদের রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে। এই ৩০ জনকে সেনা ক্যাম্পে নিয়ে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। ১৬ জনের দল থেকে ১৪ জন নিখোঁজ এখন, আর বাকি ২ জন হাসপাতালে ভর্তি। রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরু হয় ২০২২ সালে ফেব্রুয়ারিতে। ৬ জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে আছেন। আলী হাসান জানান, ১৬ জনের একটি দলে তাঁকে রাখা হয়েছিল। মাত্র পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণের পর ষষ্ঠ দিনে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। মাইলের পর মাইল হেঁটে শুকনো খাবার খেয়ে তিন দিন পর তাঁরা একটি মাটির নিচের সেনা ক্যাম্পে পৌঁছান। একপর্যায়ে তাঁদের দলের বাকি ১১ জনও যোগ দেন। আলী হাসান আরও বলেন, একপর্যায়ে হাতে অস্ত্র দিয়ে, সেনাবাহিনীর পোশাক পরিয়ে একজন করে পাঠানো হয় সামনের দিকে। তিনি জানান, যুদ্ধে রাজি না হলে বন্দী করে রাখে, মারধর করে, শাস্তি দেয়। তাঁদের বলা হয়েছিল যুদ্ধ করতে হবে না, শুধু সামনে-পিছে যাতায়াত করতে হবে। কিন্তু এটি ছিল একটি মরণফাঁদ, যেখানে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন। ২০২৩ সাল থেকে ৫৪ জন বাংলাদেশির এমন পরিস্থিতির খবর পাওয়া গেছে।
আলী হাসানের পাশাপাশি গোপালগঞ্জের পলাশ শেখও একই পরিস্থিতির শিকার। ড্রোন হামলায় এক হাত হারানো পলাশ গত ২৪ দিন ধরে মস্কোর একটি হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তাঁর বোন চুমকি খানম ২৬ জুলাই প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পলাশকে উদ্ধার ও আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করেছেন। একই দিনে আলী হাসানের স্ত্রী আকলিমা খাতুনও তাঁর স্বামীকে উদ্ধার ও পরিবারের ঋণের চাপের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী জানান, রাশিয়ার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে হাসপাতালে ভর্তি থাকা বাংলাদেশিদের সব ধরনের চিকিৎসা খরচ ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে এবং সুস্থ হওয়ার সাথে সাথেই তাঁদের দেশে ফেরানোর দায়িত্ব বাংলাদেশ দূতাবাসকে নিতে হবে। এদিকে, রাশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকা কেউ দেশে ফেরার জন্য দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করেননি। রাশিয়ায় নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ দেশে আসে না এবং তাঁদের পরিবার কোনো ক্ষতিপূরণও পায় না।