ড্রোন হামলায় এক পা হারিয়ে ফেলা এবং রক্তপাত বন্ধের আশায় নিজের অন্য পা কেটে ফেলার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত এক ভবনের নিচে ছোট্ট গর্তে টানা আট মাসেরও বেশি সময় চরম মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন ইউক্রেনের ৪৯ বছর বয়সি সেনা কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকো। চারপাশে শত্রুপক্ষের ড্রোন টহল দেওয়ায় ঐতিহ্যগত স্থলপথ বা গাড়ির মাধ্যমে তাকে সরিয়ে নেওয়ার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। অবশেষে মৃত্যুর প্রহর গুণতে থাকা এই সেনাকে আকাশে ঝুলিয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে গেছে বিশাল এক মালবাহী ড্রোন।
গত ৪ অক্টোবর সম্পন্ন হওয়া এই উদ্ধার অভিযানে ভ্লাসেনকোকে ড্রোন থেকে ঝুলিয়ে মাটি থেকে প্রায় ৭০ মিটার বা ২ ৩০ ফুট উঁচুতে তুলে ১৫ কিলোমিটার দূরের এক নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়। ইউক্রেনীয় সামরিক কর্তাদের দাবি অনুযায়ী, দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ইতিহাসে কোনো আহত সেনাকে আকাশপথে চালকবিহীন ড্রোনের সাহায্যে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।
ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের সদস্য ভ্লাসেনকো গত বছরের মে মাসে খারকিভ অঞ্চলের একদম সম্মুখসারির যুদ্ধে অংশ নিতে যান। সেখানে ‘বাসকি’ নামের এক সহযোদ্ধার সঙ্গে ছোট একটি মাটির বাংকারে দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। প্রথমদিকে ড্রোনের মাধ্যমে তাদের নিয়মিত খাবার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছানো হতো। এমনকি ভ্লাসেনকোর জন্মদিনে ড্রোনে করে উপহার হিসেবে চকলেট ও দামি সিগারেটও পাঠানো হয়েছিল। তবে প্রায় ১০ মাস সেখানে থাকার পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে বাংকারে পানি ঢুকে পড়লে তারা কাছের এক ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুল ভবনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
স্কুল ভবনে আশ্রয় নেওয়ার পরপরই বিস্ফোরণে ভ্লাসেনকোর বাঁ পায়ের পাতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং পড়ে গিয়ে ডান পায়ে মারাত্মক আঘাত পান। প্রাণ বাঁচাতে তিনি বাধ্য হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুলের পুরোনো বয়লারঘরের নিচে মাত্র ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটার আকারের একটি ছোট্ট গর্তে আশ্রয় নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার বাঁ পায়ের ক্ষত পচে যেতে থাকে এবং ডান পায়ের নিচের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে হাড় বাইরে বেরিয়ে আসে। এই পরিস্থিতিতে নিজের ছুরি দিয়ে ডান পায়ের ক্ষতিগ্রস্ত পাতা কেটে ফেলে টুর্নিকেটের সাহায্যে রক্তপাত বন্ধ করেন তিনি। ভ্লাসেনকো জানান, হাড় বাইরে বেরিয়ে আসায় এবং পেছনের দিকে পা টেনে চলতে না পেরে তাকে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, যার ফলে তার আর কোনো পা অবশিষ্ট ছিল না।
স্কুলের নিচের সেই গর্তে টানা আট মাস আটকে থাকা ভ্লাসেনকো ইউক্রেনের সম্মুখসারিতে মোট ৪৯১ দিন অবস্থান করেন। আকাশজুড়ে সার্বক্ষণিক শত্রুপক্ষের ড্রোনের আনাগোনা থাকায় এই এলাকাটি ‘কিল জোন’ হিসেবে পরিচিত ছিল। আহত সেনাদের পিকআপ কিংবা সাঁজোয়া যান দিয়ে উদ্ধার করা সেখানে পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ইউক্রেনীয় বাহিনী আগে দুটি চালকবিহীন স্থলযান পাঠিয়ে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করলেও রুশ ড্রোন হামলায় সেগুলো ধ্বংস হয়ে যায়।
উদ্ধার অভিযানের দায়িত্বে থাকা সামরিক কর্মকর্তা ‘অ্যালেক্স’ জানান, আশা যখন প্রায় শেষ হয়ে আসছিল, তখন স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ‘গুরজুফ ডিফেন্স’-এর তৈরি ছয়টি উল্লম্ব রোটরবিশিষ্ট একটি নতুন ভারী মালবাহী ড্রোনের ওপর ভরসা করা হয়। কালো রঙের বিশালাকার এই ড্রোনটি সর্বোচ্চ ৯০ কেজি ওজন বহন করে ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে সক্ষম। অক্টোবরের শুরুতে নিয়মিত রসদের সঙ্গে ভ্লাসেনকোর কাছে একটি বিশেষ সেফটি বেল্ট বা হারনেস এবং নির্দেশনা সংবলিত ভিডিওসহ একটি ফোন পাঠানো হয়।
অবশেষে ৪ অক্টোবর চার ঘণ্টার সুপরিকল্পিত অভিযানে সেই ড্রোনটি ভ্লাসেনকোর ওপর পৌঁছায়। একটি ক্যারাবিনারের সাহায্যে নিজেকে ড্রোনের উইঞ্চের সঙ্গে যুক্ত করেন তিনি। প্রধান এই উদ্ধারকারী ড্রোনটির নিরাপত্তার জন্য আকাশে আরও তিনটি ছোট ড্রোন পাঠানো হয়, যা শত্রু ড্রোনকে বিভ্রান্ত করে। পাশাপাশি ইউক্রেনীয় বাহিনীর চারটি এফপিভি ড্রোন দল, কামান এবং স্থির-পাখার ড্রোন দিয়ে টানা দুই ঘণ্টা রুশ অবস্থানে হামলা চালিয়ে আকাশপথ মুক্ত রাখা হয়। শঙ্কা কাটিয়ে ১৫ মিনিটের এক উড়াল শেষে তিনি নিরাপদে পৌঁছান।
খারকিভের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের দুই ব্যান্ডেজ মোড়ানো পা নিয়ে ভ্লাসেনকো সেই রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। আকাশে ওড়ার সেই মুহূর্ত সম্পর্কে তিনি জানান, বনে পড়ে যাওয়ার ভয় তার ছিল না, তবে সাঁতার না জানার কারণে সবচেয়ে বেশি ভয় ছিল পানিতে পড়ে যাওয়ার। ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী ও উদ্ধারকারী ড্রোনের প্রকাশিত ফুটেজের সঙ্গে তার বর্ণনার মিল পাওয়া গেছে।
পরদিন, ৪ অক্টোবর, সেখানে পৌঁছায় বিশাল ছয় প্রপেলারের ড্রোনটি। ভ্লাসেনকো একটি ক্যারাবিনারের সাহায্যে ড্রোনের উইঞ্চে ঝোলানো হারনেসের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। এরপর ড্রোনটি তাকে প্রায় ৭০ মিটার বা ২৩০ ফুট উচ্চতায় তুলে নেয়।