জনপ্রিয় প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপি, যা ওয়েবসাইট হোস্ট করা সার্ভারে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, তাতে সম্প্রতি দুটি মারাত্মক নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত করেছেন সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যালিফ এবং উইজের গবেষকেরা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সহায়তায় এই ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করা হয়েছে। যদিও পিএইচপি কর্তৃপক্ষ ত্রুটিগুলোর সমাধান করে নতুন সংস্করণ প্রকাশ করেছে, তবুও হ্যাকাররা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে সাইবার হামলা চালাচ্ছে।
এই সাইবার হামলার শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশের সরকার ও নিরাপত্তা সংস্থা নজিরবিহীন সতর্কতা জারি করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এআই ও সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক লেকচারার অ্যান্ড্রিউ কুলেন জানান, বিশ্বের অসংখ্য যন্ত্র একটি মৌলিক সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল, যেখানেই এই বাগটি পাওয়া গেছে। এই ত্রুটির সুযোগ নিয়ে একজন হ্যাকার ওয়েবসাইটে নিজের কোড চালাতে পারেন, ওয়েবসাইট পরিবর্তন করে ফেলতে পারেন বা তথ্যভান্ডারে থাকা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করতে বাধ্য করতে পারেন।
ক্লাউড সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠান উইজ জানিয়েছে, সমস্যাটি পিএইচপির ভেতরেই রয়েছে এবং এর ফলে পিএইচপির যেকোনো সংস্করণে চলা সাধারণ ওয়েবসাইটও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এই ত্রুটিগুলো পিএইচপি কোডবেজে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে লুকিয়ে ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। পিএইচপি ৫.৪ থেকে পরবর্তী সব সংস্করণে এই ত্রুটি কার্যকর থাকলেও এত দিন তা কারো নজরে আসেনি। এই ত্রুটির মাধ্যমে একজন আক্রমণকারী কোনো ধরনের পাসওয়ার্ড বা বৈধ অ্যাকাউন্টের অ্যাকসেস ছাড়াই দূরবর্তী অবস্থান থেকে ক্ষতিকর কোড বা কমান্ড চালাতে পারেন। এই ত্রুটিগুলোকে 'পিএইচপি২শেল' হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে এবং তীব্রতা মূল্যায়ন স্কেলে ১০-এর মধ্যে ৯.২ দেওয়া হয়েছে।
আমাজনের নিরাপত্তাপ্রধান সিজে মোসেস জানিয়েছেন, গত ২০ অক্টোবর পিএইচপির ত্রুটি প্রকাশ্যে আসার চার দিন আগেই আমাজনের নিরাপত্তাদল এই ত্রুটি কাজে লাগিয়ে সাইবার হামলার একটি চেষ্টা শনাক্ত করেছিল। ক্যালিফ এবং উইজের প্রতিবেদনগুলো যখন অপ্রকাশিত ছিল, তখন হ্যাকাররা কীভাবে এই ত্রুটি সম্পর্কে জানতে পারলেন, তা স্পষ্ট নয়। বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইট পিএইচপি দিয়ে তৈরি, যার মধ্যে ওয়ার্ডপ্রেস, ড্রুপাল ও জুমলার মতো প্ল্যাটফর্মগুলো অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশের সফটওয়্যার প্রকৌশলী ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা সুমিত সাহা জানিয়েছেন, পিএইচপিতে মেমোরি ব্যবস্থাপনা এবং বিশেষ করে মেমোরি শেষ হয়ে যাওয়ার মতো মারাত্মক ত্রুটি সামলানোর প্রক্রিয়ায় দুর্বলতাগুলো তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের অনেক ওয়েবসাইট পিএইচপি দিয়ে তৈরি হলেও সময়মতো হালনাগাদ বা প্যাচ প্রয়োগ করা হয় না, যা সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই সংকট থেকে নিরাপদ থাকার প্রধান উপায় হলো অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার ও কোড হালনাগাদ করা। ২১ অক্টোবর প্রকাশিত পিএইচপি ৮.২.৩৫, ৮.৩.৩৬, ৮.৪.২৭ ও ৮.৫.১২ সংস্করণে এই নিরাপত্তা ত্রুটিগুলোর সমাধান করা হয়েছে। পিএইচপি ফাউন্ডেশন এবং মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাসহ বিশ্বমানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ওয়েবসাইট প্রশাসকদের অবিলম্বে নিরাপত্তা প্যাচ ইনস্টল করার পরামর্শ দিয়েছে।