যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের মুখে ইরানের সঙ্গে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থলসীমান্তপথ বন্ধ ও সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ও ইরাক। মার্কিন নৌ অবরোধ ও সম্প্রসারিত নিষেধাজ্ঞার ফলে এমনিতেই কোণঠাসা অবস্থায় থাকা ইরানি অর্থনীতির ওপর এই সীমান্ত কড়াকড়ির প্রভাব বেশ নেতিবাচক হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সূত্রমতে, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন তেহরানের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখলেও উভয় দেশের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা বর্তমানে কার্যত থমকে রয়েছে।
পাকিস্তান সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি সীমান্ত বাণিজ্য সহজীকরণের একটি পূর্ববর্তী আদেশ তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করে নেয়। এর জের ধরে গত অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় থেকে বেলুচিস্তান প্রদেশের তাফতান এবং গাবদ-রিমদান সীমান্তপথ দিয়ে বাণিজ্যিক পণ্য আদান-প্রদান স্থগিত করা হয়। বেলুচিস্তানের উপদেষ্টা শহিদ রিন্দসহ পাকিস্তানি কর্মকর্তারা এই পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়ে জানান, চোরাচালান রদ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান শুক্রবার বলেন, একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ আইন অনুযায়ী সব নিষেধাজ্ঞা মেনে চলে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখবে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ অবশ্য পরিস্থিতিকে একটি সাময়িক কারিগরি বিঘ্ন হিসেবে অভিহিত করে সমস্যা সমাধানে ইসলামাবাদের সঙ্গে আলোচনার কথা জানিয়েছে। সীমান্তগুলোতে যাত্রী পারাপার চালু থাকলেও পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে তাফতান ও গাবদ-রিমদান সীমান্তে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), চাল, ফলমূলসহ নানা পণ্য বোঝাই শত শত থেকে প্রায় দুই হাজার ট্রাক আটকে রয়েছে। উল্লেখ্য, পাকিস্তান ইরান থেকে দৈনিক গড়ে সাত হাজার টন পণ্য আমদানি করে থাকে, যার মধ্যে কেবল গাবদ-রিমদান পথেই চার হাজার টনের বেশি এলপিজি আসত।
সীমান্ত বন্ধের প্রভাব ইতিপূর্বে পাকিস্তানের স্থানীয় বাজারেও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ৪ হাজার ৫০০ রুপি থেকে বেড়ে ৭ হাজার রুপি বা তারও বেশিতে গিয়ে পৌঁছেছে। সরকারি হিসাবে পাকিস্তান ও ইরানের মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সীমিত হলেও এই সীমান্ত অচলাবস্থার কারণে পচনশীল পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অন্যদিকে, ইরাকের মাইসান প্রদেশের ব্যস্ততম শিব সীমান্তপথটি গত ২১ অক্টোবর থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সব ধরনের যাত্রী, যানবাহন ও বাণিজ্যিক ট্রাক চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইরাকি কর্মকর্তারা সীমান্ত নিরাপত্তার তথ্য পর্যালোচনা ও চোরাচালান বন্ধে আধুনিক শনাক্তকরণ যন্ত্র বসানোর অজুহাত দিলেও, একাধিক সূত্র এটিকে বাগদাদের ওপর ওয়াশিংটনের সামগ্রিক মনস্তাত্ত্বিক চাপের অংশ বলে উল্লেখ করেছে। ইতিপূর্বে ইরাকি ভূখণ্ড ব্যবহার করে ড্রোনসংক্রান্ত তৎপরতা ও হামলা চালানোর বিষয়ে মার্কিন প্রশাসন উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল। খবরে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, শিব সীমান্ত ছাড়াও ইরাক ধাপে ধাপে ইরানের সঙ্গে আরও কিছু সীমান্তপথ বন্ধ করে দিতে পারে, যদিও বর্তমানে কিছু বিকল্প বাণিজ্যপথ খোলা রয়েছে।
সমুদ্র ও আকাশপথে মার্কিন নৌ অবরোধ এবং ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর মতো কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে স্থলপথের ওপর অনেকটাই নির্ভর হয়ে পড়েছিল। তবে শিব সীমান্তপথ বন্ধ হওয়ায় ইরাকের অভ্যন্তরে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা প্রতিবাদ সভা শুরু করেছেন। সীমান্তপথগুলো ঠিক কত দিন বন্ধ থাকবে কিংবা ওয়াশিংটনের প্রশাসনিক চাপ আরও কতটা প্রসারিত হবে, তা নিশ্চিত না হলেও এই পদক্ষেপ ইরানের স্থল বাণিজ্যের ভবিষ্যৎকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।