আর্জেন্টিনার লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেস একবার লিখেছিলেন, সময়ই সেই উপাদান যা দিয়ে তিনি তৈরি। তাঁর মতে, সময় একটি নদী যা তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, অথচ তিনিই সেই নদী। আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও এই উক্তির গভীরে রয়েছে চেতনার এক জটিল রহস্য। আমরা সময়ের মধ্যে বাস করি, সময় মেপে জীবন সাজাই, কিন্তু যে সময়কে আমরা অবিচ্ছিন্ন মনে করি, তা কি সত্যিই একটি নদীর মতো বহে চলে, নাকি তা আলাদা আলাদা মুহূর্তের সমষ্টি—সুতোর মধ্যে গাঁথা পুঁতির মতো?
আঠারো শতকের দার্শনিক ডেভিড হিউম মনকে নানা উপলব্ধির সমষ্টি হিসেবে দেখেছিলেন, যা অবিশ্বাস্য দ্রুততায় পরিবর্তনশীল। তবে উনিশ শতকের মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম জেমস এই ধারণায় একটি অসুবিধা খুঁজে পান। জেমসের মতে, আমাদের চেতনা একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ বা ‘স্ট্রিম অব কনশাসনেস’। তিনি এই ধারাবাহিকতাকে বোঝার জন্য উনিশ শতকের খেলনা ‘জোট্রোপ’-এর উদাহরণ দিয়েছেন। একটি ড্রামে আঁকা স্থির ছবিগুলো নির্দিষ্ট গতিতে ঘুরলে আমাদের মস্তিষ্ক সেগুলোকে একটি চলমান দৃশ্যের মতো ব্যাখ্যা করে। জেমস যদি আরও পরে লিখতেন, তবে হয়তো চলচ্চিত্রের উদাহরণ দিতেন, যেখানে প্রতিটি স্থির ফ্রেম মিলে একটি চলমান ঘটনা তৈরি করে। দার্শনিক অঁরি বের্গসনও ১৯০৭ সালে তাঁর ‘ক্রিয়েটিভ ইভল্যুশন’ বইয়ে চিন্তার সঙ্গে চলচ্চিত্রের তুলনা করেছিলেন, তবে তাঁর কাছে মুহূর্তগুলো নিছক আলাদা ছবি ছিল না; তারা একে অপরের মধ্যে মিশে যেত, ঠিক যেমন একটি সুরের নোট আরেকটি নোটের সঙ্গে মিলিত হয়ে সংগীত তৈরি করে।
বর্তমানকে আমরা কখনোই সম্পূর্ণ একা অনুভব করি না; এর সঙ্গে মিশে থাকে অতীতের স্মৃতি এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশা। এই পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমেই চেতনা প্রবাহমান হয়। অলিভার স্যাকস তাঁর ‘দ্য ম্যান হু মিস্টুক হিজ ওয়াইফ ফর আ হ্যাট’ বইয়ে জিমি নামের এক রোগীর কথা উল্লেখ করেছেন, যিনি স্মৃতিভ্রংশের কারণে একটি মুহূর্তের মধ্যে আটকে ছিলেন। তাঁর কাছে জীবন ছিল বর্তমানের এক ক্ষুদ্র আলোর বিন্দু, যার পেছনে কোনো স্মরণযোগ্য অতীত নেই, সামনে কোনো কল্পনাযোগ্য ভবিষ্যৎ নেই।
স্নায়ুবিজ্ঞানী অলিভার স্যাকস মাইগ্রেনের রোগীদের মধ্যে ‘সিনেমাটোগ্রাফিক ভিশন’ বা চলচ্চিত্রের মতো দৃষ্টির বিভ্রম পর্যবেক্ষণ করেছেন, যেখানে চলমান পৃথিবী স্থির ছবির ধারায় ভেঙে যায়। ১৯৭০ সালে তিনি এই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন। এছাড়া মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত রোগীদের ক্ষেত্রে লেভোডোপা ওষুধ ব্যবহারের ফলে চেতনার প্রবাহ সাময়িকভাবে থেমে যাওয়ার ঘটনাও তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। হেস্টার ওয়াই নামের এক রোগীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বাথরুমে পানি উপচে পড়লেও তিনি ঘরের মাঝখানে স্থির দাঁড়িয়ে ছিলেন, কারণ তাঁর অভিজ্ঞতা একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে আটকে ছিল।
আমাদের মস্তিষ্ক বাইরের আলোকে কেবল গ্রহণ করে না, বরং তা ব্যাখ্যা করে। নেকার ঘনকের বিভ্রম বা ঘূর্ণায়মান পাখার উল্টো দিকে ঘোরার দৃশ্য আমাদের এটাই প্রমাণ করে যে, মস্তিষ্ক বাস্তবতাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডে গ্রহণ করে এবং সেগুলোকে জুড়ে দিয়ে গতির অনুভূতি তৈরি করে। জেরাল্ড এডেলম্যানের ‘নিউরাল ডারউইনিজম’ বা স্নায়বিক ডারউইনিজম ধারণা অনুযায়ী, অভিজ্ঞতার প্রভাবে মস্তিষ্কের সংযোগগুলো শক্তিশালী হয় এবং মস্তিষ্ক নিজেকে পুনর্গঠন করে। এই প্রক্রিয়া আমাদের টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়ায়, কারণ বর্তমানের সংকেতকে অতীত স্মৃতির সঙ্গে মেলাতে পারলে বিপদ চেনা সহজ হয়।
মানুষের চেতনা কেবল একটি ক্যামেরা নয়, বরং এটি স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে তৈরি একটি ব্যক্তিগত কাহিনি। ক্রিস্টোফার ইশারউড তাঁর বার্লিন-দিনলিপিতে খোলা শাটারের ক্যামেরার উপমা ব্যবহার করলেও মানুষের চেতনা আসলে নিরপেক্ষ নয়। আমরা নিজেদের জীবনের চলচ্চিত্রের পরিচালক হিসেবে প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে নিজের মতো করে সাজাই। উইলিয়াম জেমসের মতে, প্রতিটি চিন্তা আগের চিন্তার উত্তরাধিকার বহন করে এবং পরের চিন্তার হাতে কিছু না কিছু তুলে দেয়। শেষ পর্যন্ত, বোর্হেসের সেই নদীর উপমায় ফিরে আসতে হয়। আমরা হয়তো অসংখ্য ক্ষণস্থায়ী মুহূর্তের সমষ্টি, কিন্তু সেই মুহূর্তগুলো একে অপরের মধ্যে মিশে গিয়ে আমাদের একটি অবিচ্ছিন্ন সত্তা হিসেবে গড়ে তোলে। অলিভার স্যাকস (১৯৩৩–২০১৫) ছিলেন একজন ব্রিটিশ স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ও লেখক, যিনি মানুষের মস্তিষ্ক ও চেতনার রহস্যকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে সাহিত্যের মিশেলে তুলে ধরেছিলেন।