প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামীকাল ২৬ অক্টোবর চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে জাপান যাচ্ছেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে এই সফরে তিনি শীর্ষ বৈঠকের পাশাপাশি টয়োটা কারখানা ও জেরার এলএনজি টার্মিনাল পরিদর্শন করবেন। এই সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যকার বিনিয়োগ ও জ্বালানি খাতে নতুন গতির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
সফরের সময় বঙ্গোপসাগর ঘিরে জাপানের ‘বিগ-বি’ (বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট) পরিকল্পনাটি পুনরায় সাজানোর প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ২০১৪ সালে তৎকালীন জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের উদ্যোগে সূচিত এই মহাপরিকল্পনাটি বিনিয়োগ, জ্বালানি, সমুদ্র নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতি—এই চারটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে হালনাগাদ করা হচ্ছে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর এ বিষয়ে একটি যৌথ বিবৃতি আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপানে অবস্থান করবেন। সফরের দ্বিতীয় দিন ২৭ অক্টোবর সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া তিনি জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন এবং চিবার ফুতসুতে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও এলএনজি টার্মিনাল পরিদর্শন করবেন।
বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে জাপান দীর্ঘদিনের নির্ভরযোগ্য অংশীদার। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ প্রকল্প, ঢাকা মেট্রোরেল এবং হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো মেগা প্রকল্পগুলো জাপানের সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, টোকিও এখন ঋণনির্ভর সহায়তার পাশাপাশি বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব ও সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগের (পিপিপি) ওপর জোর দিচ্ছে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে।
জাপানি গণমাধ্যম নিক্কেই এশিয়া জানিয়েছে, জাপানের বেসরকারি খাত আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইয়েন (প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগের রূপরেখা তৈরি করছে। এর বড় অংশই উৎপাদন ও জ্বালানি খাতে। টয়োটা প্রায় ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগে বাংলাদেশে গাড়ি অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা করছে, যা শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ও কর্মসংস্থান তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া, শিল্প খাতের গ্যাস–সংকট মোকাবিলায় জাপানের জ্বালানি প্রতিষ্ঠান জেরা মহেশখালী-মাতারবাড়ী এলাকায় এলএনজি টার্মিনাল ও অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে।
হালনাগাদ করা বিগ-বি পরিকল্পনায় আঞ্চলিক সংযোগ ও লজিস্টিকসকে প্রাধান্য দিয়ে মাতারবাড়ীকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্য রয়েছে। এর মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে পণ্য পরিবহনের সুবিধা তৈরি হবে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বৈশ্বিক সংকটে বিকল্প সামুদ্রিক পথ হিসেবে বাংলাদেশকে প্রস্তুত রাখা, ব্যবসা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর নিয়ম প্রতিষ্ঠা এবং বঙ্গোপসাগরে মুক্ত নৌচলাচল নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। জাপান ইতিমধ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে পাঁচটি টহল নৌযান হস্তান্তর করেছে এবং কোস্টগার্ডকে ৩৫ মিটার দীর্ঘ একটি আধুনিক টহল জাহাজ দেওয়ার প্রক্রিয়াও এগিয়ে যাচ্ছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থানে বাংলাদেশ জাপানের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী অংশীদার। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও জ্বালানি-হাব চালু হলে তা দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যে বিকল্প সরবরাহ শৃঙ্খলের নতুন রূপরেখা তৈরি করবে এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক লজিস্টিকস হাব হিসেবে গড়ে তুলবে।