চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) দেশে সামগ্রিক আমদানিতে প্রবৃদ্ধি ঘটলেও এর উল্টো চিত্র দেখা গেছে মূলধনি যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে দেশে মোট এক হাজার ২৮৯ কোটি ৬০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের এক হাজার ১৪৯ কোটি ৩০ লাখ ডলারের তুলনায় ১৪০ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা ১২.২০ শতাংশ বেশি। তবে এই প্রবৃদ্ধির বিপরীতে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ৩২.৪৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, গত অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে মূলধনি পণ্যের আমদানি ছিল ২০০ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা চলতি অর্থবছরের একই সময়ে কমে ১৬০ কোটি ৫০ লাখ ডলারে নেমেছে। এর মধ্যে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমাণ ৭৫ কোটি ১০ লাখ ডলার থেকে কমে ৫০ কোটি ৭০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। সামগ্রিক আমদানিতে এই প্রবৃদ্ধি মূলত জ্বালানি তেল আমদানির কারণে হয়েছে, যেখানে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ১১.৬ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া শিল্পের কাঁচামালসহ মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি ১৯.১৩ শতাংশ বেড়ে ৭১০ কোটি ৪০ লাখ ডলার থেকে ৮৪৬ কোটি ৩০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে, তবে তুলা আমদানি ৫.৬১ শতাংশ কমেছে।

বস্ত্র খাতের মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সাবেক সহসভাপতি আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, গত তিন বছর ধরেই দেশে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক। তিনি বলেন, নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পরবর্তী সময়ে ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট ও অসহযোগিতামূলক মনোভাবের কারণে উদ্যোক্তারা অর্থায়ন পাচ্ছেন না। সরকার ৪০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৫০০ কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে। এছাড়া ডলারের উচ্চমূল্যে টাকার অবমূল্যায়ন বিদ্যমান ব্যবসায়ীদের কার্যকরী মূলধন কমিয়ে দিয়েছে এবং গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকট নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে, যার ফলে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে অনাগ্রহী।

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মাসাদুল ইসলাম বলেন, ইউটিলিটি সুবিধা ছাড়া কারখানা চালানো অসম্ভব এবং সরকার আগামী দুই বছরেও গ্যাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না বলে জানানোয় উদ্যোক্তারা মেশিনারি এনে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। অর্থনীতিবিদদের মতে, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ার মানে হলো বিনিয়োগ থমকে যাওয়া, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এদিকে, আগস্ট শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৪.৭৫ শতাংশে নেমেছে, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৫-২০ দিন আগে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে। জ্বালানি সংকট আগে থেকেই ছিল, তবে সম্প্রতি তা প্রকট হওয়ায় অনেক উদ্যোক্তা আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সংকটের সমাধান কীভাবে হবে, তা নিয়েও তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এজন্য মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

গত আগস্ট শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৪.৭৫ শতাংশে, যা ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এর ফলে নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাচ্ছে। টানা কয়েক মাস ধরে এই হার এক অঙ্কের ঘরে অবস্থান করছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে নতুন ঋণ চাহিদা কমে যায়। নতুন শিল্প স্থাপন বা বড় কারখানা সম্প্রসারণ না হলে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি স্বাভাবিকভাবেই সীমিত থাকে।