বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের আন্তর্জাতিক দরপত্রে বিদেশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাড়াতে নতুন নীতিনির্ধারণী উদ্যোগ নিয়েছে সরকারের জ্বালানি বিভাগ। পূর্বের দরপত্রে সাড়া না পাওয়ার পরিস্থিতি এড়াতে দরপত্র জমার সময়সীমা চার মাস বাড়িয়ে আগামী বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আগ্রহ সৃষ্টি করতে সমুদ্রের ভূগর্ভস্থ জরিপ তথ্য উন্মুক্ত ও সহজলভ্য করা এবং উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি (পিএসসি) আরও আকর্ষণীয় করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
চলতি বছরের মে মাসে বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকে (গভীর সমুদ্রে ১৫টি ও অগভীর সমুদ্রে ১১টি) তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এতে প্রথমে ১ জুন থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বাঁধা থাকলেও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগের ঝুঁকি বিবেচনায় কোম্পানিগুলোর অনুরোধে এই সময়সীমা বাড়ানো হয়। গত ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত তুরস্কের টার্কিশ পেট্রোলিয়াম ওভারসিজ কোম্পানি (২৩ জুলাই), চীনের সিনুক ইন্টারন্যাশনাল (১৭ আগস্ট) এবং চীনের সিনোপ্যাক (গত মাসে) দরপত্রের নথি কিনেছে। তবে এই তিনটি কোম্পানি আগে কখনো বঙ্গোপসাগরের অনুসন্ধানে অংশ নেয়নি।
বহুজাতিক কোম্পানির মতামত সরাসরি নিতে সরকারের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে বৈঠক করেছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মার্ফি ওয়েল, ব্রাজিলের পেট্রোব্রাস, কুয়েতের কেইউএফপিইসি, অস্ট্রেলিয়ার জিও এক্সপ্লোরেশন, সিঙ্গাপুরের ইউনিয়ন এনার্জি গ্রুপ ও কানাডার ভেলিউরার সঙ্গে আলোচনা হয়। এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর ইতালির ইএনআই, মার্কিন কোম্পানি এক্সনমবিল ও যুক্তরাজ্যের বিপির সঙ্গে এবং ১ অক্টোবর যুক্তরাজ্যের শেলের সঙ্গে পৃথক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি সিঙ্গাপুরে এশিয়ার আরও ছয়টি কোম্পানির মতামত নেওয়া হয়। এসব বৈঠকে কোম্পানিগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা সমুদ্রের জরিপ সংক্রান্ত তথ্য উন্মুক্ত করা এবং বিশ্লেষণ সাপেক্ষে অতিরিক্ত সময় চাওয়ার পরামর্শ দেন। আগামী বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে শীর্ষ মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও বৈঠক করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এ বিষয়ে জানান, বহুজাতিক কোম্পানি ও বিভিন্ন দেশের জ্বালানিমন্ত্রীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার ভিত্তিতে সময় বাড়ানো হয়েছে এবং তাদের দাবি অনুযায়ী তথ্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। বাজারের চাহিদা অনুধাবন করে এসব পদক্ষেপ নেওয়ায় এবার দরপত্রে ভালো সাড়া পাওয়া যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সাগরে গ্যাসের সম্ভাবনা বিচারে দেশে মোট ছয়টি আলাদা জরিপ তথ্য রয়েছে। আগে ২০২৪ সালের দরপত্রে এসব জরিপের প্রতিটির দাম ধরা হয়েছিল ১০ লাখ ডলার, যা চলতি দরপত্রে কমিয়ে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ডলার করা হয়। নতুন সিদ্ধান্তের আওতায় এর চারটিকে বিনামূল্যে উন্মুক্ত করা হয়েছে এবং বাকি ছয়টি জরিপ তথ্যের প্রতিটির দাম কমিয়ে মাত্র ৫ হাজার ডলার ধরা হয়েছে, যাতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সহজে তথ্য বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
নতুন পিএসসি-২০২৬ চুক্তিতে বেশ কিছু বড় ধরনের সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। পিএসসি-২০১৯-এ গভীর সমুদ্রে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম ৭.২৫ ডলার এবং অগভীর সমুদ্রে ৫.৫০ ডলার নির্ধারিত ছিল। ২০২৩ সালের পিএসসিতে অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের ১০ শতাংশ হারে গ্যাসের দাম ধার্য করা হয়। এবার তা সংশোধন করে গভীর সমুদ্রে ব্রেন্ট ক্রুডের ১১ শতাংশ এবং অগভীর সমুদ্রে ১০.৫ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার হলে গভীর সমুদ্রের গ্যাসের দাম দাঁড়াবে প্রতি হাজার ঘনফুটে ১১ ডলার। বাজারে অতিরিক্ত অস্থিরতা এড়াতে প্রতি পাঁচ বছরের জন্য এতে উচ্চ ও নিম্নসীমা ঠিক করে দেওয়া হবে।
এ ছাড়া নতুন চুক্তিতে অনুসন্ধান ব্যর্থ হওয়ার পরও ঠিকাদার কাজ চালিয়ে যেতে চাইলে মুনাফার অংশ ১ থেকে ২ শতাংশ বাড়ার সুযোগ রয়েছে। গ্যাস সরবরাহের পাইপলাইন ঠিকাদার কোম্পানি নির্মাণ করবে এবং মজুত, সরবরাহ ও খরচ সাপেক্ষে তারা একটি আলাদা ট্যারিফ পাবে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকার শ্রম আইন সংশোধন করে বিদেশী জ্বালানি কোম্পানিগুলোর জন্য শ্রমিক তহবিলে মুনাফার অংশ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১.৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। অগভীর সমুদ্রের ব্লকে রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাপেক্সের ১০ শতাংশ অংশীদারত্ব থাকবে। আগের মতো আয়কর ও শুল্ক অব্যাহতি, পেট্রোবাংলা কর্তৃক ঠিকাদারের আয়কর পরিশোধ, পেট্রোবাংলা না কিনলে তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি বা রপ্তানির সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে যাওয়ার অধিকার বহাল থাকছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, গ্যাসের বৈশ্বিক দাম এবং বিনিয়োগ ঝুঁকি পর্যালোচনা করেই বহুজাতিক কোম্পানিগুলো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গ্যাসের দাম বাড়ায় আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তবে তারা অন্য দেশের প্রস্তাবনা ও ঝুঁকি হিসাব করেই পা বাড়াবে। ফলে দরপত্রে কতটি কোম্পানি অংশ নেবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। বিইআরসির সাবেক সদস্য (গ্যাস) মকবুল ইলাহী চৌধুরী আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে অন্যতম বড় বাধা উল্লেখ করে বলেন, বঙ্গবন্ধুর সময়ে ৪৬টি কোম্পানি অংশ নিয়েছিল এবং তথ্য উন্মুক্ত ছিল, তবে পরবর্তীতে জটিলতা বাড়ায় বিদেশি কোম্পানির আগ্রহ কমে যায়।
ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৭৩ সালে তৎকালীন মুজিব সরকারের আমলে প্রথম দরপত্রে ছয়টি বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে পিএসসি সই হয় এবং ইউনিয়ন গ্যাস কুতুবদিয়ায় গ্যাস সন্ধান পায়। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তৎকালীন মোশতাক সরকারের সময়ে তারা চলে যায়। এরপর ১৯৮৮ সালের দরপত্রে কেউ আসেনি। পিএসসি-১৯৯৪-এর অধীনে কেয়ার্ন এনার্জি ১৯৯৮ সালে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন শুরু করে, যা ২০১৩ সালে বন্ধ হয়। পিএসসি-২০০৮-এর আওতায় আসা কনোকো ফিলিপস গ্যাসের দাম বাড়ানোর দাবি পূরণ না হওয়ায় ২০১৫ সালে কাজ গুটিয়ে নেয়। একইভাবে পিএসসি-২০১২-এর মাধ্যমে আসা সান্তোস ২০২০ সালে এবং ওএনজিসি ও পস্কো দাইয়ু গ্যাসের পর্যাপ্ত দাম ও ব্যবসায়ের অজুহাতে চলে যায়। ২০১২ সালে মিয়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পরও বড় কোনো আবিষ্কার সম্ভব হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে দরপত্রের সময় তিন মাস বাড়ানো হলেও নথি কেনা সাতটি কোম্পানির কেউই শেষ পর্যন্ত দরপত্র জমা দেয়নি। বর্তমান সরকার তাই ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
যদিও মাঝে ২০০৭ সালে কেয়ার্ন থেকে শেয়ার কিনে নিয়ে পরিচালনার দায়িত্বে আসে অস্ট্রেলিয়ার সান্তোস।পিএসসি-২০০৮–এর আওতায় চুক্তি করে ২০১০ সালে গভীর সমুদ্রে কাজ শুরু করে মার্কিন কোম্পানি কনোকো ফিলিপস।
২০১৭ সালে বিশেষ পিএসসির আওতায় আসে কোরীয় কোম্পানি পস্কো দাইয়ু।