বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা বছরের পর বছর একই পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন, যা তাঁদের মধ্যে গভীর হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ৩৬তম বিসিএসের কর্মকর্তারা, যারা ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন, তারা চাকরির নবম বছরে পদার্পণ করলেও এখনো প্রভাষক পদেই রয়ে গেছেন। এই দীর্ঘসূত্রতা কেবল ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের বিষয় নয়, বরং এটি শিক্ষা প্রশাসনের সামগ্রিক দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কারণ, যাঁরা শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেন এবং শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় ভূমিকা রাখেন, তাঁদের পেশাগত অগ্রগতির পথ দীর্ঘদিন আটকে থাকলে তা শিক্ষা খাতের জন্যও উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) তথ্যানুযায়ী, বিসিএসের ২৬টি ক্যাডারের মধ্যে পদোন্নতি ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্য রয়েছে। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র, কর ও কৃষিসহ অন্যান্য ক্যাডারের তুলনায় তাঁদের পদোন্নতির সুযোগ সীমিত। অন্যান্য ক্যাডারে পর্যাপ্ত পদ না থাকলেও সংখ্যাতিরিক্ত (সুপারনিউমারারি) পদ সৃষ্টি করে পদোন্নতির ব্যবস্থা করা হয়, কিন্তু শিক্ষা ক্যাডারের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও আর্থিক জটিলতার কথা বলে তা আটকে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে এই ক্যাডারে প্রায় ১৬ হাজার পদ রয়েছে, যার মধ্যে হাজারের বেশি পদ শূন্য।
বর্তমানে প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জটিলতা তীব্র হয়েছে। সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য প্রভাষক পদে পাঁচ বছর ধারাবাহিক ও সন্তোষজনক চাকরি, সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া, বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) সন্তোষজনক থাকা এবং বনিয়াদি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার মতো শর্ত পূরণ করতে হয়। মাউশির সূত্র বলছে, নতুনদের মধ্যে ৩৬তম, ৩৭তম ও ৩৮তম বিসিএসের অধিকাংশ প্রভাষক এসব যোগ্যতা অর্জন করেছেন। নবম গ্রেডে চাকরিতে যোগ দেওয়া এসব কর্মকর্তা যোগ্যতা অর্জনের পরও একই গ্রেডে রয়ে গেছেন।
সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেলে কর্মকর্তারা জাতীয় বেতন স্কেলের ষষ্ঠ গ্রেডে বেতন পাবেন। জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী, ষষ্ঠ গ্রেডে শুরুর মূল বেতন হবে ৭১ হাজার টাকা, যা ২০১৫ সালের পুরোনো বেতন কাঠামোয় ছিল ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা। মূল বেতনের সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও মুঠোফোন ভাতাসহ বিভিন্ন ধরনের ভাতা যুক্ত হবে। সব মিলিয়ে ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে যখন ভাতাও কার্যকর হবে, তখন এ পদের একজন কর্মকর্তার মোট বেতন দাঁড়াবে লাখ টাকার বেশি।
মাউশির তথ্য অনুযায়ী, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সহকারী অধ্যাপকের অনুমোদিত পদ ৪ হাজার ৯৮০টি, যার মধ্যে কর্মরত আছেন ৪ হাজার ৩১ জন। অর্থাৎ ৯৪৯টি পদ শূন্য রয়েছে। অন্যদিকে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছেন ১ হাজার ৬৮৪ জন কর্মকর্তা। অর্থাৎ শূন্য পদের চেয়ে পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তার সংখ্যা ৭৩৫ জন বেশি। এই ব্যবধানই পদোন্নতি জটিলতার মূল কারণ। মাউশি সংখ্যাতিরিক্ত পদ সৃষ্টির আবেদন জানালেও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সম্মতি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে আপাতত শূন্য থাকা ৯৪৯টি পদে পদোন্নতি দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। তবে কর্মকর্তারা শুধু শূন্য পদের বিপরীতে নয়, যোগ্যতা অর্জনকারী সবাইকে পদোন্নতির আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছেন।
শিক্ষা ক্যাডারে ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হলেও পর্যাপ্ত পদ সৃষ্টি ও নীতিমালা বাস্তবায়নের জটিলতা রয়েই গেছে। ৩৬তম বিসিএসের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রশাসনসহ অন্য ক্যাডারে তাঁদের পরের ব্যাচের কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেলেও শিক্ষা ক্যাডারে তাঁরা এখনো বঞ্চিত। সর্বশেষ ২০২৫ সালের নভেম্বরে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি হয়েছিল এবং বর্তমানে বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সভা চলমান রয়েছে।
শুধু প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক নয়, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও জটিলতা রয়েছে। আগে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের তৃতীয় গ্রেড পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ থাকলেও ২০১৫ সালের বেতন স্কেল অনুযায়ী তাঁরা সর্বোচ্চ চতুর্থ গ্রেড পর্যন্ত যেতে পারেন। মাউশির মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল চতুর্থ গ্রেডে বেতন পান, যা অনেক সহযোগী অধ্যাপকের বেতনের সমান। অধ্যাপকদের গ্রেড-৩-এ উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
দীর্ঘদিনের এই বঞ্চনার প্রতিবাদে গত ২৫ অক্টোবর মাউশির সামনে প্রভাষক পর্যায়ের কর্মকর্তারা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। তাঁরা সংখ্যাতিরিক্ত পদ সৃষ্টি করে পদোন্নতি প্রদান এবং অধ্যাপক পদকে গ্রেড-৩-এ উন্নীত করার দাবি জানিয়েছেন। মাউশির মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানিয়েছেন, পদোন্নতি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং দ্রুতই তা সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশা করছেন। তবে যোগ্যতা অর্জনকারী কর্মকর্তাদের আক্ষেপ, তাঁরা অন্য ক্যাডার তৈরির কারিগর হলেও নিজেদের পদোন্নতি নিয়ে বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।