রাজধানীর পল্টন ও বায়তুল মোকাররম এলাকা ঘিরে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি, বোমা বিস্ফোরণ এবং লগি-বইঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুষ হত্যার মতো ভয়াবহ রাজনৈতিক সহিংসতার ২০ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের সেই রক্তক্ষয়ী সংঘাত স্তম্ভিত করেছিল পুরো দেশকে। চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরপরই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন—তা নিয়ে বিরোধের জেরে সেদিন সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছিল ঢাকার রাজপথ থেকে সারাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে। দুই দশক পর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরলেও সরকারপ্রধান নির্বাচন এবং সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া ঘিরে দলগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট আবার নতুন করে দেখা দিয়েছে।

সংকটের সূচনা হয়েছিল ২০০৬ সালের অক্টোবরে। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের আন্দোলনের মুখে বিএনপি সরকার ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত করেছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হয় ২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর। তৎকালীন সাংবিধানিক নিয়ম অনুসারেই সদ্য সাবেক হওয়া প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাঁকে কোনোভাবেই মেনে নিতে রাজি হয়নি। দলটির মূল অভিযোগ ছিল, কে এম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা করার উদ্দেশ্যেই বিএনপি সরকার ২০০৪ সালে বিচারপতিদের অবসরের বয়স ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করেছিল। পাশাপাশি অতীতে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে তাঁর যুক্ততা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।

সংকট কেবল প্রধান উপদেষ্টা পদেই সীমাবদ্ধ ছিল না; নির্বাচন কমিশন ও ভোটার তালিকা পুনর্গঠন নিয়েও দুই রাজনৈতিক শিবিরের বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। দলগুলোর মধ্যকার সংলাপ ব্যর্থ হতে থাকলে রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের প্রস্তুতি জোরদার হয়। ২০০৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পল্টনের এক জনসভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলীয় কর্মী-সমর্থকদের আহ্বান জানিয়েছিলেন, কে এম হাসান দায়িত্ব নিলেই লগি, বইঠা ও লাঠিসোঁটা নিয়ে ঢাকায় আসার। পরবর্তীতে সংকটের সুরাহা না হওয়ায় ২০০৬ সালের ৫ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া দফায় দফায় বৈঠক অকার্যকর থেকে যায়। এমন পরিস্থিতিতে ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগ পল্টন ময়দানে, বিএনপি নয়াপল্টনে এবং জামায়াতে ইসলামী বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে আলাদা সমাবেশের ডাক দেয়। সহিংসতার শঙ্কায় পুলিশ পল্টন ও আশপাশের এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করলেও সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়নি।

২৭ অক্টোবর গভীর রাত থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে এবং ওই রাতেই প্রাণ হারান চারজন। পরদিন ২৮ অক্টোবর সকাল থেকেই ঢাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। পল্টন ময়দানের দখল নেওয়াকে কেন্দ্র করে সকালে প্রথম পুলিশের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংঘর্ষ হয়। দুপুরের দিকে দলটির নেতাকর্মীরা দৈনিক বাংলা মোড়ের দিকে এগোতে থাকলে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বেঁধে যায়। দিনভর পল্টন মোড়, জিরো পয়েন্ট, গুলিস্তান ও বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ জুড়ে চলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ককটেল বিস্ফোরণ, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও প্রকাশ্যে গুলির ঘটনা। পুরো এলাকা ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় এবং গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের উৎস চেনা কঠিন হয়ে পড়ে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই পুলিশ প্রচুর টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এই সংঘর্ষের মধ্যেই পিটিয়ে ও খুঁচিয়ে মানুষ মারার নৃশংস দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী হয়। ইটের আঘাতে রাজপথে লুটিয়ে পড়া এক ব্যক্তিকে ঘেরাও করে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা নিশ্চিত করে উল্লাস করতে দেখা যায়। নিহত সেই ব্যক্তি ছিলেন মিরপুর ১০ নম্বর ওয়ার্ড ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম মুজাহিদ। পল্টনের সেই রক্তাক্ত দিনে মোট পাঁচজন প্রাণ হারান, যাদের মধ্যে চারজন জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী এবং একজন যুবমৈত্রীর নেতা ছিলেন। সংঘাতের কারণে আওয়ামী লীগ পল্টন ময়দানে সভা করতে না পারলেও জামায়াত ও বিএনপি তাদের নির্ধারিত স্থানে সমাবেশ করেছিল।

রক্তক্ষয়ী এই ঘটনার পর ২৭ অক্টোবর রাতেই বিচারপতি কে এম হাসান প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন, যা ২৮ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। শেষ পর্যন্ত ২৯ অক্টোবর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে এতে সংকট না কমে আরও ঘনীভূত হয়। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন নির্ধারণ করা হলেও বিরোধী জোট তা বর্জনের ঘোষণা দেয়। টানা অবরোধ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পটভূমিতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাসমর্থিত জরুরি অবস্থা জারি হয়, যা রাজনীতিতে ‘এক-এগারো’ হিসেবে পরিচিত। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন সরে দাঁড়ালে ১২ জানুয়ারি ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রায় দুই বছর দেশ পরিচালনা করে। সে সময় শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানসহ প্রথম সারির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের কারাবন্দী হতে হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট। কিন্তু যে নিরপেক্ষ ব্যবস্থার জন্য দলটি অতীতে রাজপথে নেমেছিল, তা তুলে দিতেও বেশি সময় নেয়নি। ২০১১ সালের ১০ মে আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করলেও পরবর্তী দুই মেয়াদ এটি বজায় রাখার সুযোগ রেখেছিল। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা। এর ফলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচনই ব্যাপক বিতর্কিত হয়। ২০১৪ সালে ১৫৩ আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ের মাধ্যমে একতরফা নির্বাচন, ২০১৮ সালে ‘রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালে ডামি প্রার্থীর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। টানা সাড়ে ১৫ বছর শাসনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তীব্র ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।

গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আবার পুনর্বহাল হয়, যেখানে বিধান রাখা হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্তির পরই কেবল নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হতে পারবে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগের মাধ্যমে গঠিত হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ২০৯টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে এবং জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটে ৬৮.৩ শতাংশ ভোট পেয়ে সংস্কার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়।

তবে দুই দশক পর আবার যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বাছাইয়ের কথা উঠেছে, তখন আবারও দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক বিভাজন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বিএনপির সংসদ সদস্যরা আলাদা শপথ না নিলেও জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিরোধী দলের প্রার্থীরা শপথ নিয়েছেন। তারা গণভোটের রায় অনুযায়ীই সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে অটল। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত ১২ সদস্যের বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা চলছে। জুলাই সনদে উল্লেখ রয়েছে—প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, বিরোধীদলীয় ডেপুটি স্পিকার এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত ৫ সদস্যের কমিটি প্রধান উপদেষ্টা বাছাই করবেন। সেখানে ঐকমত্য না হলে বিচার বিভাগের ২ প্রতিনিধি যুক্ত করে ৭ সদস্যের কমিটির সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিকল্প রাখা হয়েছে, যা নিয়ে বিএনপির আপত্তি রয়েছে।

এমনকি ২৪ অক্টোবরের সংবিধান বিশেষজ্ঞদের বৈঠকে সম্ভাব্য উচ্চকক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রধান বা উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি করে তাঁকে উচ্চকক্ষের স্পিকার বানিয়ে সরকারপ্রধান করার বিকল্প ধারণাও উঠে এসেছে। কিন্তু বিরোধী দলগুলো জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে রাজপথে নামার হুঙ্কার দিচ্ছে, অন্যদিকে সরকার চাইছে সংসদের মাধ্যমেই বিষয়টির সুরাহা করতে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল স্পষ্ট মতামত দিয়ে বলেছেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ভয়াবহ রাজনৈতিক ইতিহাস স্মরণে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। জুলাই সনদ ও আগের কাঠামোর বাইরে গিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ঐকমত্যের ওপরই গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অন্যদিকে গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ সতর্ক করেছেন যে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে একক সিদ্ধান্ত নিলে সংকট থেকে যাবে; রাজনীতি একবার সংসদ ছেড়ে রাজপথে চলে গেলে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

অতীতে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতাও বিরোধের কারণ হয়ে ওঠে।.লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর ‘এক-এগারো: বাংলাদেশ ২০০৭-২০০৮’ বইয়ে লিখেছেন, ‘কে এম হাসান বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ফারুক-রশিদের ভায়রা ভাই হওয়ার কারণে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার কাছে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ছিলেন না।’ (পৃষ্ঠা-৩৩)প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন ও ভোটার তালিকা নিয়েও দুই পক্ষের বিরোধ বাড়তে থাকে।

(বিবিসি বাংলা, ২৭ অক্টোবর ২০২৩)সেদিন যাঁরা নিহত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে চারজন ছিলেন জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মী।