ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী বা বিরোধী—কোনো জোটই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সরকার গঠন নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান জোরদার করেছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর মিত্ররা। কোনো প্রমাণ ছাড়াই আরব দলগুলোর নজিরবিহীন সাফল্যের পেছনে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ এনেছেন তিনি। তবে আরব নেতারা এই দাবি অস্বীকার করে উল্টো নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছেন।
গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে দেশের ২১ শতাংশ প্রতিনিধিত্বকারী সংখ্যালঘু আরব নাগরিকেরা ব্যাপকহারে ভোট দেন। নির্বাচনের ৯৯ শতাংশ ভোট গণনা শেষে দেখা গেছে, ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন কোনো জোটই পায়নি। নেতানিয়াহুর জাতীয়তাবাদী-ধর্মীয় জোট ৫৩টি আসন পেয়ে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী ও মধ্য-বামপন্থী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। অন্যদিকে, সংখ্যালঘু আরব জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো ইতিহাস গড়ে রেকর্ড ১৯টি আসন পেতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর এই হঠাৎ আক্রমণাত্মক হওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো ক্ষমতা হারানোর ভয়। আইজেনকট যদি আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের উদ্যোগ নেন, তবে নেতানিয়াহুর ক্ষমতাচ্যুতির স্পষ্ট ঝুঁকি তৈরি হবে। রাইখম্যান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আইতান গিলবোয়া জানান, ইসরায়েলের আরব ও ইহুদি নাগরিকদের রাজনৈতিক সমঝোতা বা ঐক্যকে জনগণের কাছে অগ্রহণযোগ্য করে তোলাই নেতানিয়াহুর প্রধান লক্ষ্য। যদিও আইজেনকট এখন পর্যন্ত আরব দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে জোট সরকার গড়ার সম্ভাবনা নাকচ করে রেখেছেন।
নির্বাচনের পর থেকেই নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি একাধিক বিবৃতিতে আরব শহরগুলোতে ভোট কেনাবেচা, জালিয়াতি এবং ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। দলটির দাবি, তাদের কাছে ভোট চুরির প্রমাণ রয়েছে; তবে তা এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। ইতোমধ্যে ইসরায়েলি পুলিশ জানিয়েছে, মঙ্গলবারের পর থেকে আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ দক্ষিণাঞ্চলে ভোট জালিয়াতির সন্দেহে অন্তত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে জালিয়াতির অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, নির্বাচনে কোনো অজ্ঞাত বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের চেষ্টার অভিযোগ ওঠায় তদন্তের জন্য গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতকে অনুরোধ করেছেন কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির প্রধান ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গ। লিকুদ পার্টি এই উদ্যোগকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে দাবি করেছে যে ইসরায়েলের গণতন্ত্রের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।
নেতানিয়াহুর এই পদক্ষেপকে ভিত্তিহীন ও উসকানিমূলক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন আরব রাজনৈতিক নেতারা। জয়েন্ট লিস্টের অন্যতম শীর্ষ নেতা আহমাদ তিবি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করতে নেতানিয়াহু এই বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা চালাচ্ছেন। তাঁর মূল উদ্দেশ্য হলো গাদি আইজেনকটকে ভয় দেখানো, যাতে তিনি জয়েন্ট লিস্ট বা রাআমের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের চিন্তাও না করতে পারেন।
একইভাবে আরব দল রাআমের প্রধান মনসুর আব্বাস জালিয়াতির অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক অবস্থান অস্বীকার করার যে চেষ্টা নেতানিয়াহু করছেন, তা সফল হবে না।