এবারের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে রাজধানী ও মফস্বল এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য ফুটে উঠেছে। পাসের হার এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ঢাকা মহানগরী একক আধিপত্য দেখালেও, ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় ফল বেশ হতাশাজনক। গত শনিবার প্রকাশিত ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের সব শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছেন মোট পরীক্ষার্থীর মাত্র ৩ দশমিক ২৩ শতাংশ। এছাড়া জিপিএ-৪ থেকে ৫-এর নিচে রয়েছেন ১৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ শিক্ষার্থী, যা নির্দেশ করে যে উত্তীর্ণদের বড় অংশের ফল মাঝারি মানের।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে পাসের হার ৭৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অথচ একই বোর্ডের অধীন মানিকগঞ্জে পাসের হার মাত্র ৩৮ দশমিক ২৫ শতাংশ। এছাড়া শরীয়তপুর, রাজবাড়ী, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জেও পাসের হার ৪৩ শতাংশের নিচে সীমাবদ্ধ। ঢাকা মহানগরে এক লাখের বেশি পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৮৮ হাজারের বেশি উত্তীর্ণ হয়েছেন এবং ১৩ হাজার ৪৮২ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন। বিপরীতে মানিকগঞ্জে ১০ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র চার হাজার পাস করেছেন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ৮৭ জন। শরীয়তপুরে পাস করেছেন দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী, কিন্তু জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা মাত্র ৩৫।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীন ১৩টি জেলার মধ্যে গাজীপুর (৬১ শতাংশের বেশি) ও নরসিংদী (৬৬ শতাংশের বেশি) ছাড়া অন্য কোনো জেলায় পাসের হার ৬০ শতাংশ অতিক্রম করতে পারেনি। নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর ও কিশোরগঞ্জে পাসের হার ৪৫ থেকে ৫১ শতাংশের ঘরে। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চিত্রও একই রকম; চট্টগ্রাম জেলায় পাসের হার ৫৭ শতাংশের বেশি হলেও কক্সবাজারে ৪৩ শতাংশ, খাগড়াছড়িতে প্রায় ৩০ শতাংশ, রাঙামাটিতে ৩৩ শতাংশ এবং বান্দরবানে ৪১ শতাংশের বেশি।
শহরের ভেতরেও ফলাফলের বড় পার্থক্য বিদ্যমান। রাজধানীর নটর ডেম কলেজে পাসের হার ৯৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং ঢাকা কলেজে ৯৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে, মফস্বলের অনেক প্রতিষ্ঠানে পাসের হার অত্যন্ত কম। শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কোচিং ও প্রাইভেট পড়ার সুযোগ এবং আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সক্ষমতা এই বৈষম্যকে উসকে দিচ্ছে।
ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, করোনাকালে শিক্ষার্থীদের যে শিখনক্ষতি হয়েছিল তা পূরণে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় ঘাটতি পুঞ্জীভূত হয়েছে। তিনি ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে খারাপ ফলের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাবকে দায়ী করেন। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ফল প্রকাশের অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শিখনে ঘাটতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন এবং আগামীতে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান উন্নয়ন, শিক্ষকের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শূন্যপদ পূরণের মাধ্যমে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন।