নিত্যপণ্যের চড়া দাম ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধনশীল ব্যয়ে যখন সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ, ঠিক তখনই রাজধানীর অলিগলিতে নতুন করে হানা দিয়েছে ‘জানুয়ারি-ভীতি’। পুরনো বছর বিদায় নিয়ে নতুন বছর আসার আগেই বাড়িওয়ালারা হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন ভাড়া বৃদ্ধির নোটিশ। আগামী ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ফ্ল্যাটপ্রতি অতিরিক্ত ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। বর্ধিত ভাড়া দিতে অপারগ হলে আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাসা ছেড়ে দেওয়ার শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন মালিক পক্ষ। বছরের শুরুতেই এমন আকস্মিক সিদ্ধান্তে ঘোর দুশ্চিন্তায় পড়েছেন মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মালিবাগ, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা ও ধানমন্ডি সহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ভাড়াটিয়ারা।

সম্প্রতি মিরপুর-১০ নম্বর সেকশনের বেনারশী পল্লীর ‘এ’ ব্লকের ৪ নম্বর লেনের ১৭/১৯ নম্বর বাড়ির ভাড়াটিয়াদের হাতে একটি নোটিশ তুলে দেন মালিক পক্ষ। সেখানে উল্লেখ করা হয়, পানির বিল, হোল্ডিং ট্যাক্স, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ও সার্বিক মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির কারণে আগামী ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে মাসিক ভাড়া এক লাফে ৫ হাজার টাকা বাড়ানো হলো। এতে রাজি না থাকলে অক্টোবর মাসের মধ্যে তা জানিয়ে ডিসেম্বর মাসের ভাড়া পরিশোধপূর্ব আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাসা খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ও বেসরকারি বিপণন প্রতিষ্ঠানের কর্মী রফিকুল ইসলামকে জানানো হয়েছে তাঁর ফ্ল্যাটের ভাড়া ৩ হাজার টাকা বাড়ানো হচ্ছে। গত দুই বছর ধরে ৪০ হাজার টাকা বেতনে আটকে থাকা রফিকুল আক্ষেপ করে বলেন, গত এক বছরে চালে কেজিতে ১৫ টাকা এবং ছেলের স্কুলে ১৫০০ টাকা ফি বেড়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনের গুঞ্জনে বাজার ও ভাড়া বাড়লেও বেসরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়েনি।

বাড়িভাড়া বৃদ্ধির এই প্রভাব পড়েছে নগরীর সর্বস্তরের বাসিন্দাদের ওপর। মালিবাগে ২২ হাজার টাকার ফ্ল্যাটে থাকা স্কুল শিক্ষিকা নাহিদা আক্তার জানান, গত ঈদে তাঁর স্বামী অর্ধেক বোনাস পেয়েছেন। এখন ৫ হাজার টাকা ভাড়া বাড়লে মেয়ের প্রাইভেট টিউটর বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। যাত্রাবাড়ীতে ১৫ বছর ধরে একই বাসায় থাকা ৬৫ বছর বয়সী শেখ ফরিদ জানান, তাঁর ১৪ হাজার টাকার বাসা ১৮ হাজার টাকা করা হয়েছে। এই বয়সে নতুন বাসা খোজা, অ্যাডভান্স ও ট্রাক ভাড়ার টাকা কোথায় পাবেন তা নিয়ে কান্না চেপে প্রবীণ এই নাগরিক বলেন, এই শহর যেন গরিবদের জন্য নয়। বাড্ডায় সাবলেটে থাকা সুমি আক্তার বলেন, সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় আছেন নারী চাকরিজীবীরা। তিনি জানান, ‘আমরা মেয়েরা একটু নিরাপদ বাসার জন্য ১-২ হাজার টাকা বেশি দিতে রাজি থাকি। বাড়িওয়ালারা সেই দুর্বলতাটা জানেন। তাই তারা এও জানেন, আমরা সহজে বাসা ছাড়ব না।’ বেসরকারি চাকরিজীবী ইউসুফ আলীও একই ধরণের কষ্টের কথা তুলে ধরেন। ইউসুফ জানান, স্কুল, কর্মস্থল ও যাতায়াত খরচের কথা চিন্তা করে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেকে বাড়তি ভাড়া মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে মিরপুর থেকে দক্ষিণে মেট্রো রেল চালুর পর মতিঝিল, পল্টন, শাহবাগ ও কারওয়ান বাজার যাতায়াত সহজ হওয়ায় ওই রুট সংলগ্ন এলাকাগুলোতে আগে ১১-১২ হাজার টাকার বাসা এখন ১৫-১৮ হাজার টাকায় উঠেছে।

ভোক্তা অধিকার সংস্থা কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হিসাব অনুযায়ী, গত ২৫ বছরে ঢাকায় বাসাভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ, যা একই সময়ের নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ক্যাবের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার ৫৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া তাদের আয়ের প্রায় অর্ধেক টাকা শুধু বাসাভাড়ায় ব্যয় করেন এবং ১২ শতাংশ ভাড়াটিয়া আয়ের ৭৫ শতাংশই খরচ করেন ভাড়ার পেছনে। সরকারের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত চার বছরে দেশে গড় বাসাভাড়া প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) বার্ষিক বৃদ্ধ হার ছিল ৫.২৫ শতাংশ এবং পরবর্তী প্রান্তিকে তা ৫.১৯ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে শুধু ঢাকা বিভাগে বছরের ব্যবধানে ভাড়া বেড়েছে ৫.৪৮ শতাংশ। বর্তমানে রাজধানীতে তিন রুমের ফ্ল্যাট ভাড়া এলাকাভেদে ১৮ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং অতিরিক্ত ৩ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা সার্ভিস চার্জ গুনতে হচ্ছে।

ক্যাব সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান জানান, ঢাকায় জনসংখ্যার তুলনায় পর্যাপ্ত বাসস্থান না থাকায় বাসাভাড়ার চড়া চাহিদা তৈরি হয়েছে। ভাড়ার যৌক্তিকতা প্রমাণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় ‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন’-এর প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। আবাসন খাতের সংগঠন রিহ্যাবের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ঢাকায় মাসে ২০ হাজার টাকা আয় করা মানুষকেও ঝুপড়ি ঘরে থাকতে হয়। মানসম্মত আবাসনের জন্য ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা এবং ভালো মানের ফ্ল্যাটের জন্য অন্তত ১ লাখ টাকা মাসিক আয় প্রয়োজন। এছাড়া ১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী বড় ধরনের সংস্কার ব্যতীত দুই বছরের আগে ভাড়া বাড়ানো নিষেধ এবং অযৌক্তিক ভাড়া আদায় আইনি অপরাধ হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ নেই। আইনজীবী সুলতান মাহমুদ ও ভাড়াটিয়া পরিষদের সভাপতি বাহারানে সুলতান মনে করেন, নির্দিষ্ট চুক্তি না থাকা এবং কঠোর সরকারি তদারকির অভাবে মালিকরা নিজেদের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছেন।

বাড়িওয়ালারা অবশ্য এই ভাড়া বৃদ্ধির পেছনে নিজেদের খরচের দোহাই দিচ্ছেন। ধানমন্ডির এক অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক ও বাড়িওয়ালা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একটা ফ্ল্যাটে রঙ করার মিস্ত্রি খরচ ১৫ হাজার থেকে বেড়ে ২৮ হাজার টাকা হয়েছে। এছাড়া পানির পাম্প, লিফট সার্ভিসিং, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল সবই বেড়েছে। মোহাম্মদপুর নুরজাহান রোডের বাড়িওয়ালা আমিন মোহাম্মদ বাজার অর্থনীতির কথা উল্লেখ করে বলেন, সরকার পে-স্কেল বাড়ানোর কথা বললেই বাজার থেকে শুরু করে সবাই দাম বাড়ায়। ঢাকায় মানুষের বিপুল চাহিদার কারণে তারা অনিচ্ছাসত্ত্বেও বাজারের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছেন। তবে সাধারণ ভাড়াটিয়ারা টিকে থাকতে নিজেদের খরচের খাতে কাটছাঁট করছেন। কারওয়ান বাজারের সবজি ব্যবসায়ী শফিউল্লাহ পরিবার গ্রামে পাঠিয়ে ছোট ফ্ল্যাট ছেড়ে সাবলেটে উঠেছেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাসনিম জেরিন ও রিয়াদুল ইসলাম জানান, টিউশনি ও খণ্ডকালীন কাজ করেও খাবারের ব্যয় ও রুমপ্রতি ১ হাজার টাকা বাড়তি মেস ভাড়ার নোটিশে তাদের সঞ্চয় শূন্যে ঠেকেছে। মেস মালিকরা গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধির অজুহাত দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ মেস সংঘের মহাসচিব আয়াতুল্লাহ আখতার সরকারের কাছে অনতিবিলম্বে কঠোর আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে বাসাভাড়া বৃদ্ধি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।