বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল এনে তা খোলাবাজারে বিক্রি ও শুল্ক-কর ফাঁকিসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে ১০২ কোটি ৫৭ লাখ ১৩ হাজার ১২৮ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে দুটি পোশাক কারখানা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের (সিআইসি) এক সরেজমিন তদন্তে রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেড ও লিশা টেক্স (প্রা.) লিমিটেড নামে প্রতিষ্ঠান দুটির এই বড় অঙ্কের শুল্ক-কর ফাঁকির তথ্য উদঘাটন করা হয়। ০২ নভেম্বর ২০২৬ (2026) এনবিআরের এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, দুই পোশাক কারখানার মধ্যে রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেডের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ৯৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ শত ২০ টাকা এবং লিশা টেক্স (প্রা.) লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৭ কোটি ৮৩ লাখ ২৫ হাজার ৪০৮ টাকার রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে সিআইসি। তদন্তের অংশ হিসেবে সিআইসির বিশেষ প্রতিনিধি দল উভয় প্রতিষ্ঠানের কারখানা ও গুদামে সরেজমিন অভিযান চালিয়ে কাঁচামালের মজুদ পরীক্ষা করে। একই সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত নথিপত্রের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল যাচাই করে রাজস্ব ফাঁকির এই চাঞ্চল্যকর অনিয়মগুলো উদঘাটন করা হয়।
এনবিআরের বিজ্ঞপ্তিতে রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেডের অনিয়মের বিস্তারিত তুলে ধরে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি ৪১টি ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশনের (ইউডি) মাধ্যমে বন্ড সুবিধায় ২ হাজার ৮৬২ টন ওভেন পলিয়েস্টার কাপড় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করেছিল। তবে সিআইসির পরিদর্শকরা কারখানার গুদামে এই বিপুল পরিমাণ কাপড়ের বড় একটি অংশের হদিস পাননি। হিসাব করে দেখা যায়, আমদানিকৃত কাপড়ের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ২৩৭ টন বা ৭৮ শতাংশ কাপড়ই গুদামে ছিল না। এমনকি রপ্তানির কোনো কাগজপত্রেও এই কাপড় ব্যবহারের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে সরিয়ে এসব কাপড় বেআইনিভাবে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
সিআইসি জানায়, প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি নথিতে সুতা ও নিট কাপড়ের তথ্য থাকলেও ওভেন পলিয়েস্টার কাপড়ের ক্ষেত্রে মারাত্মক গরমিল ও ঘাটতি দেখা যায়। যেসব ৩১টি ইউডির বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি কোনো ধরনের পণ্যই রপ্তানি করেনি, সেগুলোর ৩০টিতেই আমদানিকৃত পুরো কাপড় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, আংশিক রপ্তানি সম্পন্ন হওয়া ১০টি ইউডির ক্ষেত্রেও আমদানি করা কাপড়ের প্রায় ৫৩ শতাংশের কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।
কারখানায় সরেজমিন পরিদর্শনের সময় এনবিআরের তদন্ত দল ৬৯ হাজার ৩৮২ কেজি সুতা, ৮ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯৭ পিস তৈরি পোশাক এবং মাত্র ২৫ হাজার ৫৩৩ দশমিক ৫০ কেজি ওভেন পলিয়েস্টার কাপড় মজুদ দেখতে পায়। প্রতিষ্ঠানটির মোট পলিয়েস্টার কাপড় আমদানির তুলনায় এই মজুদের পরিমাণ মাত্র শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ। সিআইসির হিসাব অনুযায়ী, খোলাবাজারে পাচার ও সরিয়ে নেওয়া এই কাপড়ের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৩৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা, যার বিপরীতে সরকারের ৯৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭২০ টাকার শুল্ক-কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, অনিয়মে জড়িত অপর প্রতিষ্ঠান লিশা টেক্স (প্রা.) লিমিটেড বন্ড সুবিধায় প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার কেজি পলিয়েস্টার কাপড় আমদানি করলেও কারখানা বা গুদামে তার অস্তিত্ব মেলেনি। এসব কাপড় বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে বেআইনিভাবে সরিয়ে খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে। কেবল খোলাবাজারে কাপড়ের এই অবৈধ বিক্রির খাতেই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৬ কোটি ৯০ লাখ টাকার শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়েছে।
এছাড়াও লিশা টেক্সের বিরুদ্ধে অনুমোদিত পরিমাণের চেয়ে বেশি পোশাক বিদেশে পাঠালেও চুক্তিমূল্যের চেয়ে কম রপ্তানিমূল্য প্রদর্শনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। একই সঙ্গে ইউডির বাইরে স্থানীয় বাজার থেকে কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ২০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত পূরণ না করার প্রমাণও তদন্তে মিলেছে। প্রতিষ্ঠানটি মূসক পরিশোধ ও অনুমোদন ছাড়াই স্থানীয় উৎস থেকে চার লাখেরও বেশি পিস পোশাকের আনুষঙ্গিক কাঁচামাল ক্রয় করেছে। পাশাপাশি লাইসেন্সবিহীন এক প্রতিষ্ঠানের কাছে ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকার কিট ব্যাগ সরবরাহ করে মূসক ফাঁকি দেওয়া হয়। এসব অনিয়ম মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব ফাঁকির মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৮৩ লাখ ২৫ হাজার ৪০৮ টাকা।
এনবিআর স্পষ্ট করেছে যে, রাজস্ব সুরক্ষা ও বন্ড সুবিধার অপব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করতে সিআইসির এই ধরনের ঝটিকা পরিদর্শন ও কঠোর প্রতিরোধমূলক অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।