ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সহপাঠী ছাত্রীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে আপত্তিকর ছবি তৈরি, অশ্লীল বার্তা পাঠানো এবং ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে উল্টো বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়েছেন ১০ শিক্ষার্থী। মঙ্গলবার এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদের ডিনের ছেলে হওয়ায় বিদ্যালয় প্রশাসন শুরু থেকেই তার প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, সকালে তারা প্রতিবাদ জানাতে প্রাঙ্গণে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে কর্তৃপক্ষ তাদের শ্রেণিকক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখে। পরে তালা ভেঙে বেরিয়ে শিক্ষার্থীরা ‘হয়রানিমুক্ত স্কুল চাই’, ‘মেয়েদের নিরাপত্তা চাই’ এবং ‘ওর বাবা ডিন হলে আমাদের বাবা কি রিকশাওয়ালা?’ ইত্যাদি স্লোগান সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রতিবাদ জানায়।

শিক্ষার্থীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের হয়রানি ও হুমকি বন্ধ করা, পাঠদান থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের পুনর্বহাল করা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনের নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন।

ভুক্তভোগী ছাত্রীরা অধ্যক্ষের কাছে দেওয়া অভিযোগে জানায়, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে তাদের সঙ্গে কুরুচিপূর্ণ আচরণ করে আসছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্রী জানায়, চার বছর ধরে সে তাকে উত্ত্যক্ত করছে এবং একাধিকবার অশোভন স্পর্শ করেছে। এমনকি তার ব্যক্তিগত ছবি বাইরের স্কুলগুলোতেও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আরেক ভুক্তভোগী জানায়, অশালীন মেসেজ ও ধর্ষণের হুমকির বিষয়টি আগে শিক্ষকদের জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ঘটনার ধারাবাহিকতা বর্ণনা করে শিক্ষার্থীরা জানায়, অক্টোবরের শুরুর দিকে ৬০-৭০ জন শিক্ষার্থী অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার ফোন থেকে বিকৃত ছবি ও বার্তা মুছে ফেলতে বলে। এর পর ৭ অক্টোবর অভিযুক্তের বাবা (যিনি বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন) এবং দুজন সহকারী প্রক্টর বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। পরদিন ৮ অক্টোবর ১০ শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা চলাকালীন আলাদা কক্ষে আটকে রেখে লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয় এবং তাদের একটি মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর থেকে ওই শিক্ষার্থীদের ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং প্রতিবাদ অব্যাহত রাখলে টিসি দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তদন্তের নামে শিক্ষার্থীদের দিয়ে অভিযুক্তকে মারধরের মিথ্যা স্বীকারোক্তি সম্বলিত কাগজে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ভুক্তভোগীদের পরিবারকে অভিযুক্তের পরিবারের পক্ষ থেকে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।

বিদ্যালয় প্রশাসন এ কে এম নূর আলম সিদ্দিকী ও এনামুল হক সজীবকে নিয়ে দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, তবে শিক্ষার্থীরা এই কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আরিফুর রহমান জানান, তদন্তের স্বার্থেই শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমের বাইরে রাখা হয়েছে এবং শিখন ঘাটতি পূরণ করে দেওয়া হবে। তদন্ত কমিটি নিয়ে শিক্ষার্থীদের অনাস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, তিনি ভিসি স্যারের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন এবং কোনো অবিচার হতে দেবেন না। অন্যদিকে, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবা তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং উল্টো অভিযোগ করেছেন যে, ৭ অক্টোবর সহপাঠীরা তাঁর ছেলেকে তুলে নিয়ে মারধর করেছে।