নির্বাচনের ছয় দিন আগে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শীর্ষ দুই ডজনেরও বেশি কৌশলবিদ একটি গোপন ভিডিও কলে যুক্ত হয়েছিলেন। সেখানে পরিবেশ ছিল বিষণ্ন। আলোচনা শুরু হয়েছিল সায়ানাইড নিয়ে। প্রেসিডেন্টের প্রধান জনমত জরিপকারী টনি ফাব্রিজিও প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনি কি প্রথমে সাদা বড়িটি চান, নাকি কালো বড়িটি?’ রিপাবলিকান পার্টির অন্যতম শীর্ষ তথ্য বিশ্লেষক টিম সেলার দুটি পরিস্থিতি তুলে ধরেন। প্রথম পরিস্থিতিতে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের ম্যাগা ইনকরপোরেটেড সুপার পিএসি তাদের কাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসতে সক্ষম হচ্ছিল। তিনি বলেন, ‘এটাই আশাবাদী পরিস্থিতি।’ অন্য পরিস্থিতিটি ছিল সম্পূর্ণ বিপর্যয়ের। হোয়াইট হাউস ছেড়ে প্রেসিডেন্টের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কৌশল তদারকির দায়িত্ব নেয়া জেমস ব্লেয়ার হাসির মধ্যে বলেন, আমি আমার ব্যক্তিগত বিষয়গুলো গুছিয়ে নিচ্ছি। আমার মনে হয়, অন্য সবারও একই কাজ করা উচিত। ফোনালাপে উপস্থিত চারজনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০ মিনিট ধরে ফোনালাপে চলতে থাকে মৃত্যুর মুখোমুখি মানুষের অন্ধকার রসিকতা। সেখানে ছিল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন, কারাগারের খাবার, প্রেসিডেন্টের ক্ষমা প্রদর্শন এবং এমনকি দেশ ছেড়ে পালানোর প্রসঙ্গেও সংক্ষিপ্ত আলোচনা। ব্লেয়ার বিদ্রূপ করে বলেন, অন্তত বিবি (বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু) জিতেছেন। তিনি আমাদের রক্ষা করবেন। তার আগের দিনই ইসরাইলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়। এর পরপরই তার দল দাবি করে, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। ফাব্রিজিও বলেন, হয়তো আমরা ইসরাইলে রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে পারি।

ইরান যুদ্ধ ভোটারদের কাছে এতটা শক্তিশালী প্রভাব ফেলেছিল কারণ এটি একটি সহজ গল্প তুলে ধরেছিল। প্রার্থী হিসেবে ডনাল্ড ট্রাম্প নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নতুন একটি যুদ্ধ শুরু করেন। তিনি দ্রব্যমূল্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু পেট্রোলের দাম আকাশচুম্বী হয় এবং মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ধসের গল্প শুধু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের গল্প না; এটি ক্ষমতার সীমাহীন অপব্যবহার ও অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষার গল্পও। ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির পর রাজনৈতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়া ট্রাম্প যখন আবার ফিরে আসেন, তখন তার কিছু উপদেষ্টা বিশ্বাস করেছিলেন, তিনি হয়তো নিজেকে এমনভাবে বুঝিয়েছেন যে রাজনৈতিক নিয়মকানুন কেবল তার জন্যই স্থগিত হয়ে গেছে। মঙ্গলবার রাতে সেই বিভ্রম পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। প্রায় দুই বছর ধরে আত্মম্ভরিতা ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্সির শাসনদর্শনে পরিণত হয়েছিল। একের পর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছিল। সেসব প্রতিবেদনে উঠে আসছিল, ট্রাম্প, তার পরিবার এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা নির্লজ্জভাবে নিজেদের সম্পদ বাড়াতে প্রেসিডেন্সিকে ব্যবহার করেছেন। এসব প্রতিবেদন ভোটারদের মধ্যে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। অক্টোবরের শুরুতে ফক্স নিউজের একটি জনমত জরিপে দুর্নীতিকে ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ হিসেবে দেখা যায়। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, প্রেসিডেন্ট কেবল মার্কিন জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থে কাজ করেন। এখানে স্বার্থের কোনো সংঘাত নেই। ২০২৫ সালে ট্রাম্প গোটা বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেন। এর ক্ষতিকর প্রভাব এক বছরেরও বেশি সময় পরেও অনুভূত হচ্ছিল কানসাস, টেক্সাস ও আইওয়ার মতো রাজ্যের কৃষকদের মধ্যে। এসব রাজ্য তখন হঠাৎ করেই তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে। এসবের পুরো সময়জুড়েই ট্রাম্প এমন এক উদাসীনতা দেখিয়েছেন, যা তার নীতির কারণে আরও দুর্দশায় পড়া মার্কিন জনগণের সংগ্রামকে উপেক্ষা করেছে।

ট্রাম্প যখন সীমান্তের চেয়ে নতুন বলরুম নিয়ে, মুদি পণ্যের দামের চেয়ে গলফ কোর্স নিয়ে, আর মূল্যস্ফীতির চেয়ে অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা নিয়ে বেশি কথা বলছিলেন, তখন তার দলের কিছু সদস্য বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগের দিন তিনি ন্যাশনাল মলের রিফ্লেক্টিং পুল সংস্কারের বিষয়টি নিয়ে তার শেষ নির্বাচনী প্রচারণার বক্তব্য সাজান। এ সময় রসিকতা করে বলেন, আব্রাহাম লিংকনের পরিবর্তে নিজের নামে পুকুরটির নামকরণ করার কথা তিনি বিবেচনা করছেন। অতীতের মতো এবার ডেমোক্রেটরা ট্রাম্পের প্রতিদিনকার বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ড বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উপেক্ষা করেন। তারা দুর্নীতির সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়কে যুক্ত করার চেষ্টা করেন। তারা এমন একটি সরকারের গল্প তুলে ধরেন, যেখানে সাধারণ মানুষ যখন দুর্ভোগে, তখন ক্ষমতাবান অভিজাতদের দিকে নজর দেয়া হচ্ছে। জেফরি এপস্টেইনের সুরক্ষিত সহযোগীদের থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত ২.২ বিলিয়ন ডলারের মুনাফা- সবকিছুই তাদের প্রচারণায় উঠে আসে। প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্রেটরা দ্রুত এবং অপ্রত্যাশিতভাবে ট্রাম্পের নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগের পাল্টা ব্যবস্থা নেন। একই সঙ্গে তারা রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিগুলোতেও শক্তিশালী প্রার্থী দাঁড় করিয়ে নির্বাচনী মানচিত্র বিস্তৃত করার চেষ্টা করেন। সিনেটে তারা একের পর এক উচ্চমানের প্রার্থী খুঁজে পান, যারা এমন কিছু রাজ্যকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নিয়ে আসেন, যা আগে অকল্পনীয় ছিল। প্রচারণার শেষ কয়েকটি উত্তেজনাপূর্ণ সপ্তাহে রিপাবলিকানরা উত্তর ক্যারোলাইনা ও জর্জিয়ার মতো প্রচলিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজ্য থেকে অর্থ সরিয়ে দক্ষিণ ক্যারোলাইনা, এমনকি মিসিসিপির মতো ঐতিহ্যগত শক্ত ঘাঁটিগুলোকে রক্ষার চেষ্টা করছিলেন। নিউইয়র্কের প্রতিনিধি হাকিম জেফ্রিস বলেন, ডেমোক্রেটদের নেতা এবং এখন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার হওয়ার অপেক্ষায় থাকা তিনি মনে করেন, ইরানের যুদ্ধ দুই দলের মধ্যে পার্থক্যকে আরও তীব্র করে তুলতে সাহায্য করেছে।

রিপাবলিকানরা মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ‘সাধারণ জ্ঞান বনাম উন্মাদনা’র লড়াই হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। তারা বামপন্থীদের ক্রমবর্ধমান গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক অংশের বিরুদ্ধে নিরলস আক্রমণ চালান। কিন্তু নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে নেয়া ট্রাম্পের নিজের জনমত জরিপকারীর চূড়ান্ত জরিপে দেখা যায়, ম্যাগা রিপাবলিকান পরিচিতি এবং গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র- দুটিই ভোটারদের কাছে অজনপ্রিয় হলেও ম্যাগার সঙ্গে আরও বেশি নেতিবাচক বোঝা যুক্ত ছিল। যেসব রিপাবলিকান ভোট দেয়ার পরিকল্পনা করছিলেন না, তাদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল কী করলে তারা আবার ভোট দিতে আগ্রহী হবেন। তাদের শীর্ষ দুটি উত্তর ছিল যুদ্ধ বন্ধ করা এবং মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা করা। নির্বাচনের আগের শেষ ফোনালাপে ট্রাম্পের উপদেষ্টারা নির্বাচনী পরিস্থিতি সম্পর্কে বাস্তববাদী এবং একই সঙ্গে কিছুটা কটাক্ষপূর্ণ ছিলেন। একপর্যায়ে তারা ট্রাম্পের এক মিত্রের কথা উল্লেখ করেন, যিনি মিনেসোটার গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এবং প্রাইমারিতে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত হওয়ার পরও পুনর্গণনার দাবি জানিয়েছিলেন। ব্লেয়ার বিদ্রূপ করে দলকে বলেন, দেখুন, সব ঠিক আছে। আমার মনে হয়, আমরা মাইক লিন্ডেলের মতো কাজ করব এবং যত পয়েন্টেই পিছিয়ে থাকি না কেন, পুনর্গণনার দাবি জানাব। ম্যাগা ইনকরপোরেটেড সুপার পিএসির মুখপাত্র অ্যালেক্স ফাইফার বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের সতর্ক ও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তারা মেইন, ফ্লোরিডা, টেনেসি, নিউইয়র্ক ও টেক্সাসের এমন প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনী লড়াইগুলোতে বিনিয়োগ করেছিলেন, যেখানে রিপাবলিকানরা এগিয়ে ছিলেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, যারা এসব বানানো উদ্ধৃতি ও মিথ্যা গুজব ছড়াচ্ছেন, তারা শুধু মধ্যবর্তী নির্বাচনে দলের জন্য প্রেসিডেন্টের ঐতিহাসিক ও উদার বিনিয়োগকে হেয় করছেন না, বরং এই প্রচেষ্টায় অবদান রাখা বহু মানুষের কঠোর পরিশ্রমকেও অপমান করছেন। তারা কাপুরুষ এবং পরাজিত। এক হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা, যিনি প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান, এই প্রতিবেদন সম্পর্কে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যালটে ছিলেন না। আর এটা প্রমাণিত যে, ট্রাম্প যখন ব্যালটে থাকেন, তখন তার ভোটাররা ভোট দিতে আসেন। প্রার্থীর যোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যালটে থাকা অনেক প্রার্থীকে প্রচারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেরাই যতটা প্রচার করেছেন, প্রার্থীরা নিজেদের ততটা প্রচার করতে পারেননি। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট বুধবারের শুরুতে স্বীকার করেছিলেন যে যুদ্ধ মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে। তিনি বারবার বলেছেন, ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না।

নিউইয়র্কের সিনেটর ও ডেমোক্রেট নেতা চাক শুমার যখন অত্যন্ত যত্নসহকারে সিনেটের শীর্ষস্থানীয় প্রার্থীদের নিয়োগ দিচ্ছিলেন, তখন ট্রাম্প একের পর এক এমন পদক্ষেপ নেন, যা রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে বিপদের মুখে ফেলে দেয়। আইওয়ার সিনেটর জোনি আর্নস্ট ট্রাম্পের সবচেয়ে বিতর্কিত মনোনয়নগুলোর বিরোধিতা করার বিষয়ে দ্বিধা প্রকাশ করেন। অন্যদিকে উত্তর ক্যারোলাইনার সিনেটর থম টিলিস ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ কর ও ব্যয়সংক্রান্ত বিলের বিরুদ্ধে ভোট দেন। এরপর ট্রাম্পের মিত্ররা তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ করে দেয়ার হুমকি দেন। শেষ পর্যন্ত দু’জনই অবসরের সিদ্ধান্ত নেন। এর ফলে রিপাবলিকানদের হাতে থাকা দুটি আসন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে ওঠে। উত্তর ক্যারোলাইনায় ট্রাম্প মাইকেল হোয়াটলির জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠ পরিষ্কার করে দেন। হোয়াটলি ছিলেন একজন সাবেক লবিস্ট এবং রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান। কিন্তু তিনি দুর্বল প্রার্থী হিসেবে প্রমাণিত হন এবং রাজ্যের জনপ্রিয় সাবেক ডেমোক্রেট গভর্নর রয় কুপারের কাছে পরাজিত হন। জুলাইয়ে দক্ষিণ ক্যারোলাইনার সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম মারা যাওয়ার পর ট্রাম্প তার বোন ডারলিনকে শুধু সাময়িকভাবে আসনটি পূরণ করার জন্যই নয়, বরং পূর্ণ ছয় বছরের মেয়াদের জন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করারও সমর্থন দেন। এর মাধ্যমে তিনি এমন একজন অনভিজ্ঞ প্রার্থীকে সামনে নিয়ে আসেন, যার কোনো তহবিল সংগ্রহের ভিত্তি ছিল না। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৮ সালের পর যে রাজ্যে কোনো ডেমোক্রেট সিনেটর নির্বাচিত হননি, সেখানেই তিনি পরাজিত হন। তবে দলের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যয়বহুল প্রার্থী হিসেবে প্রমাণিত হন টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন। তিনি একাধিক কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত ছিলেন। ট্রাম্প রিপাবলিকানদের বর্তমান সিনেটর জন কর্নিনকে বাদ দিয়ে প্যাক্সটনকে সমর্থন দেন। এ ক্ষেত্রে তিনি এক বছর ধরে পাওয়া সতর্কবার্তাগুলো উপেক্ষা করেন। সতর্ক করা হয়েছিল, প্যাক্সটন সিনেটের আসনটি বিপদের মুখে ফেলবেন। শেষ পর্যন্ত টেক্সাসে রিপাবলিকানদের প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়। এই অর্থ অন্য রাজ্যের প্রার্থীদের শক্তিশালী করার কাজে ব্যবহার করা যেত। প্যাক্সটন ১২ পয়েন্টের ব্যবধানে পরাজিত হন। সম্প্রতি আরেকটি ফোনালাপে ট্রাম্পের দল তাদের নির্বাচিত করার চেষ্টা করা কিছু রিপাবলিকান প্রার্থীর অযোগ্যতা নিয়ে ঠাট্টা করেছিল। এক সপ্তাহ আগে ব্লেয়ার দলকে বলেছিলেন, আমি শত্রুকে খুঁজে পেয়েছি। আর সে আমরা নিজেরাই। ফাব্রিজিও জবাব দিয়েছিলেন, অনেক জায়গায়।

২০২৫ সালের মে মাসে চাক শুমার নিউইয়র্কের হাডসন ভ্যালির একটি বিলাসবহুল রিসোর্ট ওয়াইল্ডফ্লাওয়ার ফার্মসে পৌঁছান। সেখানে দাতা ও দলের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি গোপন বৈঠকে অংশ নেন। সিনেটের নির্বাচনী মানচিত্র বিস্তৃত করা তার জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্রেটদের নিজেদের সব আসন ধরে রাখতে হতো এবং অন্তত চারটি আসন নিজেদের পক্ষে আনতে হতো। এর মধ্যে এমন কিছু রাজ্যও ছিল, যেখানে ২০২৪ সালে ট্রাম্প বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। শুমার কয়েক মাস ধরে রয় কুপারকে দলে আনার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি সাবেক সিনেটর শেরড ব্রাউনকে রাজি করাতে তিনি অন্তত তিনবার ওহাইও সফর করেন। ব্রাউন ২০২৪ সালে পরাজিত হয়েছিলেন, কিন্তু তার জনতাবাদী রাজনৈতিক পরিচিতি তখনকার জাতীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। শুমার স্মরণ করে বলেন, তিনি ৭৩ বছর বয়সী ব্রাউনকে বলেছিলেন, আপনি যদি অবসর নেন এবং আমরা যদি মাত্র একটি ভোটের ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাই, তাহলে আপনার অবসর জীবন উপভোগ্য হবে না। দুজনই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং জয়ী হন। প্রতিনিধি পরিষদে ২০২৪ সালে ডেমোক্রেটরা তিনটি আসনের ঘাটতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছিলেন। এবার তাদের প্রার্থী বাছাইকারীরা ট্রাম্পের ১০ পয়েন্ট বা তার বেশি ব্যবধানে জয়ী হওয়া নির্বাচনী এলাকাগুলোতে প্রার্থী খুঁজতে শুরু করেন। তাদের ধারণা ছিল, ক্ষমতায় শক্তিশালী হয়ে ওঠা প্রেসিডেন্ট সীমা ছাড়িয়ে যাবেন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ডেমোক্রেট প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করা সংস্থা হাউস মেজরিটি পিএসি ২০২৪ সালের নির্বাচনের একটি পর্যালোচনা প্রকাশ করে। সেখানে দলের শক্তিশালী প্রার্থীদের মধ্যে দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে আসে। সেগুলো হলোÑ ‘মধ্যপন্থী হিসেবে বিবেচিত হওয়া’ এবং অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া। পিএসির প্রেসিডেন্ট মাইক স্মিথ বলেন, আমরা যদি আরও গভীরভাবে রিপাবলিকানদের ঘাঁটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাই, তাহলে এমন প্রার্থী খুঁজতে হবে, যাদের দেখেই ভোটাররা বিরূপ হয়ে উঠবেন না। তারা এরপর স্বতন্ত্র পরিচিতির প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে শুরু করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্য, চিকিৎসক, কৃষক, দাবানল মোকাবিলায় নিয়োজিত বিশেষ প্রশিক্ষিত কর্মী এবং তেহানো সংগীতের তারকা। অর্থাৎ এমন প্রায় সবাই, যাদের দেখে পেশাদার রাজনীতিবিদ মনে হয় না।

এদিকে ট্রাম্প প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনী লড়াইয়ের মানচিত্রই নতুন করে আঁকার চেষ্টা করছিলেন। ২০২৫ সালের বসন্তে তৎকালীন উপপ্রধান স্টাফ জেমস ব্লেয়ার প্রেসিডেন্টের কাছে একটি পরিকল্পনা নিয়ে আসেন। এর উদ্দেশ্য ছিল দশক শেষ হওয়ার আগেই কংগ্রেসের নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে রিপাবলিকানদের আসনগুলোকে আরও নিরাপদ করা। টেক্সাস থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ দ্রুত অন্যান্য রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। টেক্সাসের এই পরিকল্পনার কথা প্রথম শুনে হাকিম জেফ্রিস অবিশ্বাসের সঙ্গে তার উপদেষ্টাদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, আপনারা নিশ্চয়ই মজা করছেন! তিনি টেক্সাসে উড়ে গিয়ে রাজ্য আইনপ্রণেতাদের এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানান। প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত করতে অনেক ডেমোক্রেট আইনপ্রণেতা রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যান। কিন্তু ট্রাম্পের অনুপ্রেরণায় নেয়া পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়। রিপাবলিকানরা নিজেদের জন্য পাঁচটি নতুন আসন তৈরি করেন, যেগুলোতে ২০২৪ সালে ট্রাম্প দ্বিগুণ অঙ্কের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। মনে হচ্ছিল, মধ্যবর্তী নির্বাচনে সমর্থন কিছুটা কমলেও এই আসনগুলো তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে সাহায্য করবে। ডেমোক্রেটরা পাল্টা লড়াই করেন। ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটাররা গভর্নর গ্যাভিন নিউসমের এমন একটি পরিকল্পনা অনুমোদন করেন, যার মাধ্যমে ডেমোক্রেটদের অনুকূলে পাঁচটি নতুন আসন তৈরি হয়। ভার্জিনিয়ার ভোটাররাও চারটি নতুন আসন তৈরি করে এমন একটি মানচিত্র অনুমোদন করেন। তবে পরে সুপ্রিম কোর্ট সেটি বাতিল করে দেন। শুরু থেকেই ব্লেয়ার তার নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণের পরিকল্পনা নিয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তিনি এবং প্রেসিডেন্ট এমন রিপাবলিকানদের উদ্বেগ উপেক্ষা করেন, যারা আশঙ্কা করেছিলেন এই কৌশল উল্টো ফল দিতে পারে। কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে ডেমোক্রেটদের বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ ছিল যে, তারা কয়েকটি ডেমোক্রেট-নিয়ন্ত্রিত রাজ্যে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে হুমকিটি নিষ্ক্রিয় করে ফেলেছেন। জেফ্রিস একটি উদযাপনমূলক সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে ট্রাম্প ও ব্লেয়ারের মুখের ছবি সংবলিত একটি পোস্টার প্রদর্শন করা হয়। পোস্টারে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে থাকা এক বেনামি উদ্ধৃতি লেখা ছিল: ‘সর্বত্র, সব সময়, সর্বোচ্চ মাত্রার যুদ্ধ।’ পোস্টারটি দেখে ব্লেয়ার জেফ্রিসের শীর্ষ সহযোগী গিডিয়ন ব্র্যাগিনকে টেক্সট করেন, আপনি কি এর একটি কপি আমার অফিসে পাঠাতে পারবেন? কিন্তু পোস্টারটি প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্রেটদের সদর দপ্তরেই থেকে যায়। নির্বাচনের দিন পর্যন্ত সেটি সেখানেই ছিল। সেদিন ডেমোক্রেটদের নীল জোয়ার এমনকি রিপাবলিকানদের অনুকূলে তৈরি করা বহু নির্বাচনী এলাকাকেও ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

২০২৬ সালের শুরুতে প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী অভিযান মিনিয়াপোলিসে সহিংস হয়ে ওঠে। সেখানে দুই বিক্ষোভকারীকে গুলি করে হত্যা করেন ফেডারেল এজেন্টরা। উভয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনাই ভিডিওতে ধারণ করা হয়েছিল। ট্রাম্প তার উপদেষ্টাদের বলেছিলেন, ভিডিওগুলোতে ঘটনাটি যেভাবে দেখা যাচ্ছে, তা তার ভালো লাগেনি। হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস কয়েক মাস ধরে ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে কঠোর অভিবাসন নীতি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছিলেন। এই কঠোর নীতির পক্ষে ছিলেন প্রেসিডেন্টের প্রধান নীতিনির্ধারণী উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার। মিনিয়াপোলিসের ঘটনার কিছুদিন পর ডেমোক্রেটদের অভ্যন্তরীণ জনমত জরিপে দেখা যায়, অভিবাসন ইস্যুতে দলটি প্রথমবারের মতো এগিয়ে রয়েছে। ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক ইস্যু তখন সাময়িকভাবে তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হয়েছিল। প্রেসিডেন্টের একজন জ্যেষ্ঠ কৌশলবিদ এ কথা জানিয়েছেন। এরপর দ্বিতীয় গুলির ঘটনার প্রায় পাঁচ সপ্তাহ পর ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিয়ে যান। শুরুতে ব্লেয়ার তার বসের মতোই আশাবাদী ছিলেন যে যুদ্ধটি দ্রুত সফলভাবে শেষ হবে। সংশয়ী সহকর্মীদের তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন, এই সংঘাত রাজনৈতিক বিপর্যয়ে পরিণত হবে না। কারণ, প্রতিরক্ষা বিভাগের কিছু কর্মকর্তা হোয়াইট হাউসকে জানিয়েছিলেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু প্রেসিডেন্টের চার থেকে ছয় সপ্তাহের সময়সীমা কয়েক মাসে গড়ায়। প্রকাশ্যে ট্রাম্প সামরিক বিজয়ের বড়াই করছিলেন। অন্যদিকে ব্যক্তিগত বৈঠকে উপদেষ্টারা তাকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া, পেট্রোল ও সার-এর দাম বেড়ে যাওয়া এবং মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডার উদ্বেগজনকভাবে কমে যাওয়ার বিষয়ে অবহিত করছিলেন। সংঘাত শুরুর প্রায় দুই সপ্তাহ পর মার্চে ফাব্রিজিওর ফোকাস গ্রুপগুলো দেখায়, ভোটাররা বুঝতে পারছেন না কেন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। তাদের কাছে এটি ছিল একটি ভঙ্গ করা প্রতিশ্রুতি, যা জীবনযাত্রাকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলছিল। যুদ্ধবিরোধী ডানপন্থী সাবেক মিত্রদের মধ্যে টাকার কার্লসন এবং জর্জিয়ার সাবেক কংগ্রেস সদস্য মার্জেরি টেইলর গ্রিন তখন প্রকাশ্য বিদ্রোহে নেমেছিলেন। উপদেষ্টাদের মতে, ট্রাম্প জানতেন যে যুদ্ধ তার সমর্থন কমিয়ে দিচ্ছে। তবে অল্প সময়ের জন্য মনে হয়েছিল, তিনি এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পেয়েছেন। জুনের মাঝামাঝি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা করেন। এতে ট্রাম্পের রাজনৈতিক দল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। প্রস্তাবটি নিয়ে ফাব্রিজিওর প্রথম জনমত জরিপে দেখা যায়, চুক্তি সম্পর্কে অবগত ভোটারদের মধ্যে ৪১ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে এর পক্ষে সমর্থন ছিল। ৬৭ শতাংশ মনে করেছিলেন, এটি পেট্রোলের দাম কমিয়ে আনবে। কিন্তু টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজসহ রিপাবলিকানদের ইরানবিষয়ক কট্টরপন্থীরা তেহরানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার জন্য ট্রাম্পের ওপর চাপ দেন। চুক্তিটি ভেঙে পড়ে এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়।

২০২৪ সালের নির্বাচনের পরও ট্রাম্প অর্থ সংগ্রহ বন্ধ করেননি। তিনি প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের একটি নির্বাচনী তহবিল গড়ে তোলেন। উপদেষ্টাদের কাছে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, এই অর্থকে তিনি ‘আমার টাকা’ হিসেবে দেখেন। আগস্টে, নির্বাচনের ১০০ দিনেরও কম সময় বাকি থাকতে, রিপাবলিকান সিনেটের কৌশলবিদরা তখনও জানতেন না ট্রাম্পের দল কোথায় অর্থ ব্যয় করবে। একজন কৌশলবিদ বলেন, তারা কতটা অপ্রস্তুত ছিল, তা দেখে আমি হতবাক হয়েছিলাম। ট্রাম্পের একজন উপদেষ্টা জানান, একটি পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট অনুমোদন না দেয়ায় তা প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। কোনো কোনো দিন ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে উপদেষ্টাদের বলতেন, আমাদের জিততেই হবে। যা কিছু করতে হয়, করতে হবে। অন্য দিনগুলোতে তাকে এমন মনে হতো যেন তিনি বিষয়টি নিয়ে একেবারেই পরোয়া করছেন না। তিনি সহযোগীদের বলেছিলেন, এটা আমার সম্পর্কে খুব ভালো কিছু বলে যে, আমাকে ছাড়া তারা জিততেই পারে না। ব্লেয়ার এবং অন্যদের প্রেসিডেন্টকে অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন দেয়ার জন্য বোঝাতে হয়েছিল। গ্রীষ্মের শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প সেই অনুমোদন আটকে রেখেছিলেন। এই বিলম্বের কারণে বড় ক্ষতি হয়। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, বিজ্ঞাপনের দাম তত বাড়তে থাকে। অক্টোবরের মাঝামাঝি এক সপ্তাহে অ্যাঙ্কোরেজের একটি টেলিভিশন চ্যানেলে ট্রাম্পের সুপার পিএসি শীর্ষ ডেমোক্রেট সুপার পিএসির তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করে। অথচ তারা প্রায় ৭০ শতাংশ কম বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পেরেছিল। কারণ, তারা অনেক আগে থেকে বিজ্ঞাপনের সময় বুক করেনি। ডেমোক্রেট সংগঠনটি স্থানীয় সন্ধ্যার সংবাদে একটি বিজ্ঞাপনের জন্য ২ হাজার ৭০০ ডলার দিয়েছিল। ট্রাম্পের সুপার পিএসি একই সময়ের বিজ্ঞাপনের জন্য ৩০ হাজার ডলার ব্যয় করে। সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিপদে পড়া আইনপ্রণেতারা অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখেন। কিন্তু ট্রাম্পের দল এর বিপরীত কাজ করতে চেয়েছিল। ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সহ-ব্যবস্থাপক ক্রিস লা-সিভিটা বলেন, আমরা সেই পুরোনো ধারণাকে উল্টে দিয়েছি। এভাবেই জন্ম নেয় আধুনিক যুগের প্রথম মধ্যবর্তী নির্বাচনী সম্মেলন। সেপ্টেম্বরে ডালাসে দুই দিনব্যাপী প্রেসিডেন্টকে ঘিরে এক উৎসবের আয়োজন করা হয়, যা দলের খুব কম সদস্যই চেয়েছিলেন। সম্মেলনে বক্তৃতা দেওয়ার সময় ট্রাম্প একটি চমকপ্রদ নতুন প্রস্তাব ঘোষণা করেন। রিপাবলিকানরা জিতলে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিককে ৫ হাজার ডলার দেয়া হবে। প্রস্তাবটি আসছে, এমনটি প্রায় কেউই জানতেন না। এমনকি ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক উপদেষ্টা, প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার এবং সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা পর্যন্ত বিষয়টি জানতেন না। ট্রাম্প ঘোষণা দেয়ার আগে প্রস্তাবটি নিয়ে কোনো জনমত জরিপও করা হয়নি। পরে একই ধরনের একটি প্রস্তাব যাচাই করে ট্রাম্পের দল দেখতে পায়, এটি ভোটারদের রিপাবলিকানদের দিকে আকৃষ্ট করতে খুব একটা কাজে আসেনি। প্রেসিডেন্টের নিজের কিছু উপদেষ্টা এই অর্থ বিতরণের প্রস্তাবে বিব্রত বোধ করেন। একজন এটিকে ভোট কেনার নগ্ন চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে সম্মেলনটি একটি সুখবর নিয়ে আসে- অর্থ। সম্মেলনের প্রথম দিন ইলন মাস্ক সিনেট লিডারশিপ ফান্ডকে ৭৫ মিলিয়ন ডলার পাঠান। এটি ছিল সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জন থুনের মিত্রদের পরিচালিত সুপার পিএসি। মার্কিন ইতিহাসে এককভাবে দেয়া সবচেয়ে বড় অনুদানগুলোর একটি ছিল এটি। সম্মেলনে প্যাক্সটন ওই তহবিলের স্যুইটে প্রবেশ করেন। সেখানে সুপার পিএসির নির্বাহী পরিচালক অ্যালেক্স ল্যাচাম তাকে কিছুটা রহস্যময় কথা বলেন। তিনি বলেন, আগামীকাল আপনি খুশি হবেন। বিজ্ঞাপনগুলো প্রচার শুরু হতে যাচ্ছিল। মাস্ক মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সহায়তা করতে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয় করেন। এর বড় অংশই ছিল টেক্সাসে প্যাক্সটনকে বাঁচানোর চেষ্টা। মাস্কের অর্থায়নে পরিচালিত সুপার পিএসি ডেমোক্রেট প্রার্থী জেমস তালারিকোর বিরুদ্ধে বিজ্ঞাপন প্রচারে কয়েক কোটি ডলার ব্যয় করে। এসব বিজ্ঞাপনে তালারিকোর ট্রান্সজেন্ডার অধিকার সমর্থনের বিষয়টি আক্রমণ করা হয়। ২০২৪ সালে ট্রাম্পের দল যে ধরনের আক্রমণ কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছিল, তারই পুনরাবৃত্তি ছিল এটি। অন্য নির্বাচনী লড়াইগুলোতে ট্রান্সজেন্ডারবিষয়ক বিজ্ঞাপনের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়া নিয়ে সিনেট লিডারশিপ ফান্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ট্রাম্পের দলের মতবিরোধ দেখা দেয়। ট্রাম্পের দল যুক্তি দিয়েছিল, ২০২৬ সালের নির্বাচন মূলত অর্থনীতি নিয়ে। অন্য বিষয়ে বিজ্ঞাপন চালানো কম কার্যকর হবে। কিন্তু সিনেটের রিপাবলিকান কৌশলবিদরা মনে করছিলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কিছু রাজ্যে অর্থনৈতিক বার্তাগুলো ভোটারদের কাছে তেমন কার্যকর হচ্ছে না। সিনেট রক্ষার লড়াইয়ে দলের নেতৃত্বের অক্ষমতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারা একে অপরের সঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারছিল না। ট্রাম্প এবং সিনেটের রিপাবলিকান নেতাদের মধ্যে কখনোই ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়নি। তাদের মধ্যে জন থুনও ছিলেন। প্রেসিডেন্ট তাদের আপত্তি উপেক্ষা করে প্যাক্সটনকে সমর্থন দেন। আর ২০২৬ সালের মার্চে ক্যাম্প ডেভিডে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরিকল্পনা নিয়ে ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের সঙ্গে শীর্ষ রিপাবলিকান সুপার পিএসির কর্মকর্তাদের বৈঠকে ন্যাশনাল রিপাবলিকান সিনেটরিয়াল কমিটির কাউকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

আগস্টের শেষ দিকে ডেমোক্রেট কংগ্রেসনাল ক্যাম্পেইন কমিটির শীর্ষ কৌশলবিদ জুলি মার্জ তার দলকে একত্র করেন। তিনি একটি স্লাইড দেখান, যেখানে ‘নীল জোয়ার’ বা ডেমোক্রেটদের বড় বিজয়ের সম্ভাবনা ৩৫ শতাংশ বলে অনুমান করা হয়েছিল। তিনি স্মরণ করে বলেন, ‘আমি তাদের বলেছিলাম, যত বেশি সম্ভব সার্ফবোর্ড সরবরাহ করা আমাদের দায়িত্ব। কমিটির কর্মকর্তারা দলের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বর্তমান আইনপ্রণেতাদের একটি অস্বাভাবিক প্রস্তাব দেন। তাদের রক্ষায় কোটি কোটি ডলার ব্যয় না করে সেই অর্থ আরও গভীর রিপাবলিকান ঘাঁটিতে সরিয়ে নেয়া হবে। পাশাপাশি তাদের নির্বাচনী আসনগুলোতে জরিপ চালিয়ে দেখা হবে, অর্থের প্রয়োজন আছে কি না। বেশির ভাগ আইনপ্রণেতা এতে সম্মত হন। এর ফলে নির্বাচনী মানচিত্র বিস্তৃত করার জন্য প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার পাওয়া যায়। ডালাসে রিপাবলিকান সম্মেলনের কিছুদিন পর ডিজেলের দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। সিনেটে রিপাবলিকানদের পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে পড়ে যে অক্টোবরের শুরুতে তারা দক্ষিণ ডাকোটা ও আইডাহোর মতো এমন রাজ্যগুলোতে জনমত জরিপের নির্দেশ দিতে থাকেন, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা আগে কল্পনাও করা যায়নি। নির্বাচনের এক মাস আগে সিনেট লিডারশিপ ফান্ড উত্তর ক্যারোলাইনা থেকে বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করে নেয়। রাজ্যটি ছেড়ে তারা অর্থ সরিয়ে কানসাসে, এরপর দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় এবং শেষ পর্যন্ত মিসিসিপিতে নিয়ে যায়। দুই বছর আগে ট্রাম্প মিসিসিপিতে প্রায় ২৩ পয়েন্টের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। ট্রাম্পের উপদেষ্টারা একটি ফোনালাপে বিদ্রূপ করে রাজ্যটিকে ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড মিসিসিপি’ বলে অভিহিত করেন। প্রতিনিধি পরিষদে পরিস্থিতি সম্ভবত আরও খারাপ ছিল। একপর্যায়ে কংগ্রেসনাল লিডারশিপ ফান্ড এবং ট্রাম্পের সুপার পিএসির শীর্ষ কর্মকর্তারা দক্ষিণ টেক্সাসের প্রতিনিধি হেনরি কুয়েলার আসনটি নিজেদের দখলে আনার চেষ্টা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তারা বুঝতে পারেন, যেদিন বিজ্ঞাপনগুলো বন্ধ করার কথা, সেদিনই স্পিকার মাইক জনসন ওই নির্বাচনী এলাকায় উপস্থিত থাকবেন। জনসনকে বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে বাঁচাতে তারা ঘোষণাটি এক দিন পিছিয়ে দেন। কুয়েলার বিপুল ব্যবধানে পুনর্নির্বাচিত হন। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী মানচিত্র এতটাই বাম দিকে সরে যায় যে, ১০০টিরও বেশি আসনে জরিপ চালানো প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকানরা পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেননি। এমনকি ডেমোক্রেটদের শীর্ষ নেতাদেরও এটি বিস্মিত করে।