দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যিক নগরী খুলনা এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। দিন যতো যাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ততই অবনতি হচ্ছে। প্রকাশ্যে দিনে-দুপুরে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। সেই সাথে খুন, চাঁদাবাজি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ ও লুটপাটের মতো ঘটনা নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। পথে-ঘাটে হানা দেওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও হানা দিচ্ছে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। অপরাধের সব সূচকই ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় খোদ পুলিশ প্রশাসনও উদ্বিগ্ন। এমনকি ছিনতাইয়ের কবল থেকে রক্ষা পায়নি পুলিশ প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরাও। গত ৮ অক্টোবর দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে খুলনা মহানগরীর সদর থানাধীন কলেজিয়েট স্কুলের সামনে তিন অজ্ঞাতনামা ছিনতাইকারীর হামলায় খুলনা জেলার এ-সার্কেল অফিসে কর্মরত পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলম গুরুতর আহত হন। এই ঘটনার পর রাতে একা চলাচল না করতে পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছে জেলা পুলিশ, যা সারা দেশে সমালোচনার সৃষ্টি করেছে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ২০২৬ সালের ৫ নভেম্বর পর্যন্ত খুলনা জেলা ও মহানগরীতে ২২৫ জনকে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। পুলিশের হিসাবেই গত ১০ মাসে খুলনায় ঘটেছে ৭৩টি হত্যাকাণ্ড। এর মধ্যে মহানগরীতে ৩৭টি এবং জেলার বিভিন্ন জায়গায় ৩৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। বিভিন্ন অভিযানে অর্ধ শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বারবার জামিন পেয়ে অপরাধীরা বেপরোয়া হচ্ছেন। এছাড়া ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের সময় থানা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার না হওয়া এবং পুলিশের নিষ্ক্রিয়তাকে অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতি রূপসা উপজেলায়। গত সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুরে রূপসার আঠারোবেকি নদীর চরে স্থানীয় লোকজন প্রথমে একটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। পরে ভাটার সময় পানি কমে গেলে একই স্থানে আরও একটি মরদেহ দেখতে পায়। পুলিশ জানায়, নিহত দুজনের একজন মেহেদী হাসান (৩৫) এবং অন্যজন রেজাউল করিম (৩০)। তারা শীর্ষ সন্ত্রাসী রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর গড়া ‘বি-কোম্পানি’র সক্রিয় সদস্য ছিলেন। দুজনের শরীরেই গুলির চিহ্ন রয়েছে। এছাড়া বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ডুমুরিয়া উপজেলার আমভিটা-রামকৃষ্ণপুর জোড়া বটতলা এলাকায় চায়ের দোকানে ঢুকে তরিকুল ইসলাম শেখ (৩৫) নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহত তরিকুল ডুমুরিয়া উপজেলার ১২ নম্বর রংপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুস সালাম শেখের ছেলে।

খুলনায় অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ করছে ১০টি সন্ত্রাসী গ্রুপ। এরা হলো—গ্রেনেড বাবুর বি কোম্পানি, রোহান ও পলাশ গ্রুপ, হুমায়ুন কবীর হুমা বাহিনী, আশিক গ্রুপ, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ, নবাব গ্রুপ ও নাসির গ্রুপ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, খুলনায় তা অপরাধীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চাঁদাবাজির জন্য বিদেশি নম্বর থেকে ফোন দেওয়া হচ্ছে। টাকা না দিলে প্রতিষ্ঠানে গুলি, মালিকের ওপর হামলা এবং কোথাও কোথাও প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে।

গত ২ বছরে খুলনায় ১ ডজন বিএনপি নেতা-কর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি রেলওয়ে হাসপাতাল রোডে পিটুনিতে মারা যান বিএনপি কর্মী বাবুল মোল্লা। ২৭ ফেব্রুয়ারি দিঘলিয়ার সেনহাটি ইউনিয়ন যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মুরাদ খানকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ৪ মার্চ মাসুম বিল্লাহ এবং ১৬ মার্চ রাশু নামে দুইজন খুন হন। ১২ জুন লবণচরা থানার মাথাভাঙা এলাকার কাজীপাড়া বাজারে দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হন বটিয়াঘাটা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম। ২৫ আগস্ট রূপসার দুর্জনীমহলে ছেলে জয় ঢালীকে হত্যার ৫০ দিনের মাথায় ৫ অক্টোবর বাবা আক্তার ঢালীকে খুন করে দুর্বৃত্তরা। এছাড়া ২৬ অক্টোবর বটিয়াঘাটায় যুবদল নেতা সোহেল শেখ গুলিবিদ্ধ হন এবং ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় ওহিদুল ইসলাম বাদলকে তিন রাউন্ড গুলি করে দুর্বৃত্তরা। ২৪ অক্টোবর তেরখাদায় রামিম বিশ্বাস গুলিবিদ্ধ হন। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি মানিক হাওলাদারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ১১ জুলাই মাহবুবুর রহমান মোল্লাকে গুলি করে ও পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয়। ২ নভেম্বর আড়ংঘাটা থানার ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির কার্যালয়ে হামলা ও গুলিতে এমদাদুল হক নিহত হন। ২৯ নভেম্বর রাতে আমিন মোল্লা বোয়িংকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক জানান, রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা—এই চার থানাকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত ৬ অক্টোবর থেকে জেলা পুলিশ, মহানগর পুলিশ ও এসআরবির যৌথ বিশেষ অভিযান এবং ‘ব্লক রেইড’ জোরদার করা হয়েছে। মোটরসাইকেল ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরা অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করায় চেকপোষ্টের মাধ্যমে সন্দেহভাজন মোটরসাইকেলে তল্লাশি পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বেশির ভাগই এখন দেশের বাইরে অবস্থান করে অপরাধজগতের ‘কাঠি নাড়ছে’ বলে পুলিশ জানিয়েছে।