মানুষের গতি আর সংগতি যেন আজ আর সমানতালে চলছে না, যার ফলে টিকে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। এই বিশেষ ক্রোড়পত্রের মূল বিষয়বস্তু হলো সাধারণ মানুষ কীভাবে তাদের জীবন চালিয়ে নিচ্ছেন, তাদের জীবনীশক্তি কতটুকু এবং জীবনসংগ্রামের অভিজ্ঞতাগুলো কী। সাধারণ মানুষের চাওয়া খুব বেশি নয়, তারা কেবল একটি স্বাভাবিক ও স্বস্তির জীবন চান। এই স্বস্তির নিশ্চয়তা আসে রাষ্ট্র কর্তৃক গড়ে তোলা কাঠামো বা ব্যবস্থা থেকে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনাও ছিল বৈষম্যহীন রাষ্ট্র বিনির্মাণ। কিন্তু আজও জাতি, বর্ণ, ধর্ম ও আঞ্চলিকতা নির্বিশেষে সব নাগরিকের জন্য মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরতে পরতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য রয়ে গেছে, যেখানে প্রান্তিক মানুষ ক্রমেই রাষ্ট্রীয় আবেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন।
নাগরিক সেবার রাজনীতিকরণ এক ভয়াবহ প্রবণতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা সাধারণ মানুষের পক্ষে রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করা কঠিন। উদাহরণস্বরূপ, গ্রামের একজন কৃষককে এক বস্তা সার পাওয়ার জন্য রাজনৈতিক নেতার কাছে ধরনা দিতে হয়। এই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাহীন জীবনকে এক অর্থে অধিকারহীন জীবন হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
নীতিহীন ও আদর্শহীন রাজনীতি নাগরিক জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে। এখানে নাগরিক অধিকারের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে 'সুযোগ' দেওয়ার প্রবণতা, যা একাডেমিক ভাষায় 'ক্লায়েন্টেলিজম' বা মক্কেলতন্ত্র নামে পরিচিত। রাজনীতিকরা নিজেদের অনুগত ভোটার ও সমর্থক বাড়াতে মানুষকে বিপদে ফেলে আনুগত্যপ্রবণ হতে বাধ্য করছেন, যার প্রতিফলন দেখা যায় বিভিন্ন সরকারের সময়কার কার্ড ও ভাতা প্রদানের উদ্যোগে।
জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক হওয়ার কথা ছিল সংযোগ ও আশ্রয়ের, কিন্তু রাষ্ট্র আজ অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতিদিনের জীবন সমান্তরাল গতিতে চলে না। সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজের চেষ্টায় অদম্য জীবনীশক্তির মাধ্যমে পথ খুঁজে নেন। ব্যক্তিগত সংকট মোকাবিলায় তারা রাষ্ট্রকে পায় না, বরং আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের অবলম্বন হিসেবে পান। এই ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কই প্রান্তিক মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
রাজনীতির মূল দর্শন হওয়ার কথা ছিল নৈতিকতা, আদর্শ ও জনকল্যাণ, কিন্তু সস্তা ও তাৎক্ষণিক রাজনীতির চর্চা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলো এর দায় কিছুতেই এড়াতে পারবে না। পরিশেষে, সাধারণ মানুষের এই অদম্য শক্তি ও কর্মমুখর সত্তা তাদের সাফল্যের ভিত্তি, যা রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই এক গতিশীল সত্তা হিসেবে টিকে আছে।