কক্সবাজারের টেকনাফের রঙ্গীখালী এলাকার দুর্গম পাহাড়ে সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের আস্তানা থেকে ৫৬ জন জিম্মিকে উদ্ধার করেছে যৌথবাহিনী। শুক্রবার সকালে তাদের টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের জবানবন্দিতে পাচারচক্রের ভয়াবহ নির্যাতনের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
উদ্ধার হওয়া ফরিদপুরের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান জানান, তাকে টানা আট দিন পাহাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। কুতুপালং ক্যাম্পের ইমামুল নামের এক রোহিঙ্গার প্রলোভনে পড়ে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। সেখানে পৌঁছানোর পর তার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে সিএনজি অটোরিকশায় করে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি জানান, সেখানে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি সশস্ত্র পাহারাদল ছিল এবং পালানোর চেষ্টা করায় তাকে মারধরের শিকার হতে হয়েছে।
অন্যান্য ভুক্তভোগী মো. সাইফুল ও মিজানুর রহমান সাগর জানান, নূর আলী নামের এক দালাল তাদের পাচারকারীদের হাতে তুলে দেয়। তাদের দুজনকে এক লাখ টাকায় কেনা হয়েছিল বলে তারা জানতে পারেন। প্রতিদিন সেখানে নতুন নতুন মানুষকে জড়ো করা হতো এবং কথা বলতে চাইলে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো। ক্ষুধার্ত অবস্থায় তাদের প্রতিদিন মাত্র দুবেলা কাঁচা লাউ আর ডাল খেতে দেওয়া হতো। বৃহস্পতিবার সাগরপথে ট্রলারে করে পাচারের আগেই যৌথবাহিনী তাদের উদ্ধার করে।
এদিকে, এই অভিযানে মানব পাচারকারীদের গুলিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য তিতাস শেখ (২৭) নিহত হয়েছেন। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে হ্নীলার রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ে এই গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। অভিযানে পাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়েছে এবং একটি পিস্তল, একটি দেশি বন্দুক ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের সমন্বয়ে এই অভিযান পরিচালিত হয়।
টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, উদ্ধারকৃতদের পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে এবং সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া চলমান। এছাড়া হ্নীলা ইউনিয়নের নয়াপাড়া ও লেদা ক্যাম্প সংলগ্ন পাহাড়ি ঝিরিতে অজ্ঞাত তিনজনের লাশ পড়ে থাকার খবর পাওয়া গেছে, যা উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
এই ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী পাহাড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে সাঁড়াশি অভিযানের দাবি জানিয়েছেন। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনীক চৌধুরী জানান, অপরাধীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে এবং এ ধরনের অপরাধ নির্মূলে জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন।