বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ ধরে এ দিনটি নিয়ে নানামুখী অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর পাশাপাশি সরকারি ছুটির তালিকা থেকেও দিনটিকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যাতে ঐতিহাসিক এই প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা না হয়। কিন্তু তৎকালীন সময়ের সংকট ও ঘটনাবলী পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় কেন সিপাহি-জনতার এই বিপ্লব অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।

ঘটনার সূচনা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। সেদিন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশের সাধারণ জনগণ কিংবা তার রাজনৈতিক দল কোনোটির পক্ষ থেকেই কোনো প্রতিবাদ দেখা যায়নি। তৎকালীন বাকশাল সরকারের নিয়মে দেশে দুটি বাংলা ও দুটি ইংরেজি মিলিয়ে মোট চারটি পত্রিকা চালু ছিল। পরদিনের পত্রিকাগুলোতে হত্যাকাণ্ডের খবরের চেয়ে মোশতাক সরকারের ক্ষমতার পরিবর্তনকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়। দৈনিক ইত্তেফাক প্রধান সংবাদের পাশাপাশি ‘ঐতিহাসিক নবযাত্রা’ শিরোনামে সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। দৈনিক বাংলা ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ শিরোনামে সম্পাদকীয় লিখে খন্দকার মোশতাক আহমেদকে নয়া রাষ্ট্রপতি হিসেবে তুলে ধরে। এ ছাড়া সে সময়ের সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহসহ সব বাহিনীর প্রধানেরা গণমাধ্যমে নতুন মোশতাক সরকারের প্রতি আনুগত্য ও সহযোগিতার ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে জেনারেল শফিউল্লাহ আওয়ামী লীগ মনোনীত সংসদ সদস্য হয়েছিলেন।

১৫ আগস্ট থেকে কার্যকর করে ২০ আগস্ট খন্দকার মোশতাক দেশে সামরিক শাসন জারি করেন। তখন আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ বহাল থাকা সত্ত্বেও সংবিধান নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সেনা কর্মকর্তারা ট্যাংক ও ভারী অস্ত্রসহ বঙ্গভবনে অবস্থান নিয়ে সেনা কমান্ডের বাইরে রাষ্ট্রপতির সরাসরি সান্নিধ্যে থাকেন। দেশে তখন চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল। ১৯৭৩-৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের দুঃসহ প্রভাব কাটেনি, নিত্যপণ্যের চরম সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ছিল সর্বত্র।

এরই মধ্যে ২৫ আগস্ট উপপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান শফিউল্লাহকে রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হয়। তবে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দিলেও চতুর মোশতাক জেনারেল জিয়ার ওপর পুরো আস্থা রাখতে পারেননি। সেনাপ্রধানের ওপর সরাসরি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে জেনারেল খলিলুর রহমানকে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান নিয়োগ দেওয়া হয় তিন বাহিনীর প্রধানদের নিয়ন্ত্রক হিসেবে। পাশাপাশি জেনারেল ওসমানীকে দেওয়া হয় প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্ব। সেনা বাহিনীতে শৃঙ্খলা ফেরাতে জেনারেল জিয়ার গৃহীত নানা পদক্ষেপে তারা অসহযোগিতা করতেন। একই সময় সিজিএস জেনারেল খালেদ মোশাররফ এবং ৪৬ ব্রিগেডের প্রধান শাফায়াত জামিল সেনাবাহিনীতে ভিন্ন ধারা সৃষ্টির পরিকল্পনায় মাঠে নামেন।

১৯৭৫ সালের ২ নভেম্বর রাতে ৪৬ ব্রিগেডের সহায়তায় ঢাকা সেনানিবাসে বিদ্রোহ ঘটে এবং সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। ৩ নভেম্বর রাতে খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধান পদে মোশতাকের কাছ থেকে নিয়োগ পেতে সমর্থ হন। ৪ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের ভাই আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য রাশেদ মোশাররফ ও তাদের মা একটি মিছিল নিয়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। একই সঙ্গে ৩ নভেম্বর রাতে মর্মান্তিক জেলহত্যা সংঘটিত হয়। ওই রাতেই খালেদ মোশাররফদের সঙ্গে সমঝতায় ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িত ফারুক, রশিদ, ডালিম, হুদা, নূর, পাশা ও মোসলেহ উদ্দিনদের পরিবার ও মালামালসহ বাংলাদেশ বিমানের ফকার এফ২৭ ফ্রেন্ডশিপ বিমানে ব্যাংককে পাঠানোর নিরাপদ ব্যবস্থা করা হয়। ঢাকা থেকে ব্যাংককের দূরত্ব বিবেচনায় জ্বালানি সংকটের কারণে চট্টগ্রামে বিমানটিতে আবার জ্বালানি নেওয়ার বিশেষ ব্যবস্থাও ছিল।

সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফেরানোর নামে পরিচালিত এসব তৎপরতায় সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। অন্যদিকে, বাকশালী শাসনের পুনরাবির্ভাবের শঙ্কা ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ১২ দফা দাবির প্রচারণায় এক জটিল অবস্থার সৃষ্টি হয়। দেশবাসী তখন সংকটের অবসান ঘটাতে একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক ও গ্রহণযোগ্য নেতার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। খালেদ মোশাররফের হাতে জেনারেল জিয়ার বন্দিত্ব সেনা সদস্য ও জনগণ কেউই সহজভাবে নেয়নি। ফলে সবার প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন জেনারেল জিয়াউর রহমান।

৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে দেশপ্রেমিক সৈনিকরা সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের মতোই আবার এক সংকটে দেশের হাল ধরেন তৎকালীন মেজর জিয়া। তবে জাসদ-সমর্থিত সৈনিকদের একাংশ কর্নেল তাহের ও হাসানুল হক ইনুর প্ররোচনায় ১২ দফা দাবি ও ‘সৈনিক সৈনিক ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই’ ধরনের উসকানিমূলক স্লোগান তুলে সেনানিবাসে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। সেই রক্তক্ষয়ে নারী চিকিৎসকসহ ১৩ জন সেনা কর্মকর্তা প্রাণ হারান।

৭ নভেম্বরের পর প্রধান বিচারপতি আবু সায়েমের নেতৃত্বে সামরিক শাসন বজায় থাকলেও উপপ্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমানকে বিশৃঙ্খল বাংলাদেশ পুনর্গঠনের কঠিন দায়িত্ব সামলাতে হয়। তৎকালীন পরিস্থিতিতে ৭ নভেম্বরের বিপ্লব না ঘটলে জাতীয় সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতো এবং সেনা শৃঙ্খলা চিরতরে বিনষ্ট হয়ে বাকশালী নিষ্পেষণ অব্যাহত থাকত।

৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত প্রধান সফলতা ও দিকগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:

একদলীয় বাকশাল শাসনের অবসান ঘটিয়ে বহুদলীয় ও মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি।চারটি মাত্র নিয়ন্ত্রিত পত্রিকার স্থলাভিষেক ঘটিয়ে সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা পুনর্বাহল।ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও ভৌগোলিক পরিচয় নির্বিশেষে সব নাগরিকের জন্য অভিন্ন ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়তাবাদের পরিচয় প্রতিষ্ঠা।সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার পরিবর্তে অবাধ বাজার অর্থনীতির সুযোগ প্রসারিত করা।আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের যুবশক্তির কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি।নারীদের জন্য স্বাধীন ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের পরিবেশ নিশ্চিত করা।বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর অর্থনীতির বদলে রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাকশিল্পের (আরএমজি) ওপর ভিত্তি করে শক্তিশালী অর্থনীতি গড়া।দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতায় উন্নীত করা।জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদ অর্জনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদা বৃদ্ধি।ওআইসির গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে স্থানসহ মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করা।সর্বোপরি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে স্থায়ী ভিত্তি দেওয়া।১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের মতো ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরও সিপাহি-জনতার সংহতির এক অনন্য ঐতিহাসিক বীরত্বগাথা। বাংলাদেশের সীমানা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখতে এই ঐক্যের ধারা অব্যাহত রাখার কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক।