যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টিকে বড় ব্যবধানে পরাজিত করে মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণই নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে ২৬১টি এবং সিনেটে ৫৬টি আসনে জয়লাভ করতে পারেন। এর ফলে আগামী জানুয়ারির শুরুতে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নিলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের রাজনীতি আগের দুই বছরের তুলনায় সম্পূর্ণ নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। এতদিন পর্যন্ত রিপাবলিকানদের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও নতুন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের নেওয়া বিভিন্ন নীতি কঠোর মূল্যায়নের মুখে পড়বে এবং প্রেসিডেন্টের অপছন্দের আইন পাসে বাধা দেওয়ার বাড়তি ক্ষমতা পাবেন ডেমোক্র্যাটরা। তবে সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা বহাল থাকছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের এই ভরাডুবির পেছনে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুদ্ধের একটি বড় ভূমিকা ছিল বলে স্বীকার করেছেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি মন্তব্য করেন, 'আমি মনে করি, হারের পেছনে ইরান যুদ্ধ আংশিক দায়ী। তবে একই সঙ্গে মানুষ এটাও বোঝে যে ইরানকে নিয়ে আমি যা করেছি, তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।' মূলত জ্বালানি তেল, মূল্যস্ফীতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বেলাগাম মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মার্কিন ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। নির্বাচনী প্রচারে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং অভ্যন্তরীণ খাতের ব্যয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে ডেমোক্র্যাটরা এই জনঅসন্তোষকে নিজেদের বাক্সে টানতে সক্ষম হয়েছেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি নতুন হামলার নির্দেশ দিতে পারলেও নতুন কংগ্রেসের কারণে এখন তাঁকে বড় ধরণের আর্থিক ও আইনি জটিলতায় পড়তে হবে। বিশেষ করে আগামী ১১ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সরকারি অর্থায়ন বিলের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। নতুন সামরিক বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা ট্রাম্পের সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর বড় ধরনের বাজেট নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাবেন।

তবে কংগ্রেসের এই অর্থ আটকানোর ক্ষমতা নিয়ে মিশ্র মত প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সেন্টার অন ইউএস পলিটিকসের গবেষণা ফেলো জেমস বয়েজ মনে করেন, রণাঙ্গনে ইতিমধ্যে মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকায় কংগ্রেস চাইলেই রাতারাতি যুদ্ধ তহবিল বন্ধ করে দিতে পারবে না। কারণ সেনা নিরাপত্তা ও জীবন ঝুঁকির বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। অন্যদিকে, ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজোল্যুশন’ (যুদ্ধ ক্ষমতা আইন) প্রয়োগ করেও ট্রাম্পকে পুরোপুরি থামানো কঠিন হতে পারে। ওই আইন অনুযায়ী জরুরি প্রয়োজনে প্রেসিডেন্ট পদক্ষেপ নিতে পারলেও আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষিত না হলে ৬০ দিনের মধ্যে সামরিক অভিযান গুটিয়ে নিতে হয়। তবে প্রেসিডেন্ট চাইলে এতে ভেটো দিতে পারেন, আর সেই ভেটো বাতিল করতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হয়। ডেমোক্র্যাটরা সেই দুই-তৃতীয়াংশ আসনের জাদুকরি সংখ্যা থেকে পিছিয়ে রয়েছেন।

আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে অবস্থিত ইউসিডি ক্লিনটন ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক রাজনীতির অধ্যাপক স্কট লুকাস মনে করেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও ডেমোক্র্যাটরা কৌশলগত আইন প্রস্তাবের মাধ্যমে ট্রাম্পের রিপাবলিকান জোটে চিড় ধরাতে পারেন। নির্বাচনী ফলাফলের কারণে ক্ষুব্ধ ভোটারদের কথা চিন্তা করে অনেক রিপাবলিকান সদস্য ট্রাম্প থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে লুকাস উল্লেখ করেন, স্বয়ং ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স শুরু থেকেই এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিলেন। এমনকি গত সপ্তাহেও ভ্যান্স নতুন হামলা এড়াতে ও আলোচনা ফেরাতে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধানকে চিঠি পাঠান। এমন পরিস্থিতিতে ভ্যান্স যুদ্ধ থামানোর জন্য নতুন করে চাপ দেবেন কি না, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে জেমস বয়েজ ভিন্ন এক শঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের এটিই শেষ মেয়াদ হওয়ায় তিনি নিজেকে দায়মুক্ত ভাবতে পারেন এবং দেশের রাজনীতিতে অবস্থান দুর্বল হওয়ায় বিশ্ব ইতিহাসে নিজস্ব রাষ্ট্রনায়কোচিত স্মারক বা ‘লিগ্যাসি’ রেখে যেতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আরও বাড়িয়ে দিতে পারেন।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ট্রাম্পের বিতর্কিত শুল্কনীতিও বড় ধাক্কার মুখে পড়তে পারে। গত বছর মার্কিন বাণিজ্যঘাটতি কমাতে প্রায় ৯০টি দেশের ওপর ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। গত ফেব্রুয়ারিতে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট ৬-৩ বিচারপতির রায়ে তা অবৈধ ঘোষণা করলেও ট্রাম্প প্রশাসন বিকল্প আইনের দোহাই দিয়ে নির্বাহী আদেশে শুল্কের হার ১০ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করে। কংগ্রেসের অনুমোদন না থাকলে এ শুল্কনীতি মাত্র ১৫০ দিন বহাল থাকবে। ডেমোক্র্যাটরা শুরু থেকেই এই শুল্ককে আমদানিকারক ও ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া 'জনগণের পকেট কাটা' নীতি বলে সমালোচনা করছেন। ডেমোক্র্যাটদের হাত দিয়ে শুল্ক ছাড়ের চেষ্টা হতে পারে, তবে বাণিজ্যনীতিতে স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য ২০২৮ সালের নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এছাড়া পূর্বে আদায় করা শুল্কের টাকা সরকার ফেরত দেবে কি না, তা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। তবে চীনের প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার আটকাতে দুই দলই একযোগে 'রিমোট অ্যাকসেস সিকিউরিটি অ্যাক্ট' এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন চিপ সুরক্ষিত রাখতে 'চিপ সিকিউরিটি অ্যাক্ট' বাস্তবায়নে সম্মত রয়েছে।

অভ্যন্তরীণ ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটরা এখন সব সংসদীয় কমিটির সভাপতিত্ব পাবেন, যা তাঁদের প্রত্যক্ষ তদন্ত ও সমন বা তলব করার আইনি এখতিয়ার এনে দেবে। এই ক্ষমতার বলে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য, প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক এবং ইরান যুদ্ধে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ভূমিকা নিয়ে কড়া তদন্ত শুরু হতে পারে। এমনকি ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের মতো অভিশংশন করার চেষ্টা হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি ট্রাম্পের সীমান্ত ও কঠোর অভিবাসননীতিও তদন্তের আওতায় আসছে। বিশেষ করে বিমানবন্দরে লোকজনকে আটক ও অভিবাসন আদালতে তাৎক্ষণিক শুনানির বিরুদ্ধে জনমত তীব্র ছিল; নির্বাচনের ঠিক আগে ফক্স নিউজের জরিপে ৫৩ শতাংশ ভোটার এই অভিযানকে 'অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি' বলে মতামত দেন। তবে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির (ডিএইচএস) দাবি, তাঁদের হেফাজতে থাকা ৭০ শতাংশ বন্দিই অপরাধী, যদিও বিচারে দোষী প্রমাণিত হওয়ার আগে নির্দোষ গণ্য করার আইনি নীতি তুলে ধরে সমালোচকরা সেই তথ্যের বিরোধিতা করেছেন। স্কট লুকাস মনে করেন, নতুন এই কংগ্রেসের অধীনে ডেমোক্র্যাট ও দায়িত্বশীল রিপাবলিকানরা অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে মিলে একটি দায়িত্বশীল নীতি গঠনে সচেষ্ট হবেন।

এর কারণ হতে পারে, তিনি বিশ্ব ইতিহাসে নিজের একটি অবিসংবাদিত রাষ্ট্রনায়কোচিত উত্তরাধিকার বা লিগ্যাসি রেখে যেতে চান।জেমস বয়েজ, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সেন্টার অন ইউএস পলিটিকসের গবেষণা ফেলো.যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের ২৩৭ বছরের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম—কে এই আবদুল আল-সাইদ.ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড তদন্ত, অভিবাসন ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের কী হবেঅধ্যাপক স্কট লুকাস বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের একটি বড় ফলাফল হলো, ডেমোক্র্যাটরা এখন কংগ্রেসের সব কমিটির সভাপতিত্বের দায়িত্ব পাবেন।

এমনকি ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তাঁরা ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসন বা ইমপিচ করার চেষ্টাও করতে পারেন।পাশাপাশি, ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতি নিয়ে ব্যাপক তদন্ত শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে নতুন কংগ্রেসের।ট্রাম্প প্রশাসনের শরণার্থী ও অভিবাসী বিতাড়ন নীতিতে মার্কিন কর সংস্থা ‘ইন্টারনাল রেভিনিউ সার্ভিস’ ও ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির মধ্যকার যৌথ কার্যক্রম খতিয়ে দেখতে ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের সমন জারি বা তলবের নতুন ক্ষমতা ব্যবহারের পক্ষে জোরালো সওয়াল করে আসছেন।.২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ব্যাপক হারে অভিবাসী বিতাড়নের অংশ হিসেবে ট্রাম্প বিমানবন্দরগুলোতে লোকজনকে আটক এবং অভিবাসন আদালতে তাৎক্ষণিক শুনানির ব্যবস্থা করেছিলেন।