জীবনযাপনে সচেতনতা এবং দৈনিক খাদ্যতালিকায় কিছু বিশেষ পুষ্টিকর খাবার যুক্ত করার মাধ্যমে মরণব্যাধি ক্যানসারের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। অ্যামেরিকান ক্যানসার সোসাইটির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ৩০ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে ক্যানসারের ঝুঁকি কমানো গেলে এ রোগে মৃত্যুর হার প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস করা যেতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, ক্যানসার হওয়ার পর তা নিয়ে লড়াই করার চেয়ে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন এনে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে অন্তত একজন ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। চিকিৎসকেরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে সঠিক প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে নতুন ক্যানসার রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়ে সাড়ে তিন কোটিতে পৌঁছাতে পারে, যা বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি। লিঙ্গভিত্তিক আক্রান্তের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নারীদের মধ্যে স্তন ক্যানসার এবং পুরুষদের মধ্যে ওরাল বা মুখের ক্যানসারের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাহায্যে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি শনাক্ত করতে পারলে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে ক্যানসার সম্পূর্ণ আরোগ্য করাও সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ক্যানসার কোনো একক কারণে ঘটে না। বয়স, বংশগত বৈশিষ্ট্য, ধূমপান, মদ্যপান, অতিরিক্ত শারীরিক ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, পরিবেশগত দূষণ ও নানা সংক্রমণের পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ক্যানসারের অন্যতম বড় কারণ। ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনযাপনে অনিয়ন্ত্রণের কারণে বিশ্বজুড়ে ৭ লাখেরও বেশি নতুন রোগী ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ২৬২ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন। মানবদেহের কোষ বিভাজিত হওয়ার সময় প্রতিনিয়ত ক্যানসার কোষের সঙ্গে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার লড়াই চলে। অ্যামেরিকাতেও ক্যানসারের প্রাথমিক হার বাড়ায় শুরুতেই স্বাস্থ্যকর অভ্যাস তৈরির তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।
দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস ক্যানসার ঝুঁকি নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। বছরের পর বছর ধরে যেসব খাবার খাওয়া হয়, তার সঙ্গে ক্যানসারের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক রয়েছে। এমনকি ক্যানসার রোগীদের ক্ষেত্রে সুস্থ হওয়ার পর রোগটি ফিরে আসার পেছনেও অনেক সময় একই খাদ্যাভ্যাস দায়ী থাকে। চিকিৎসকেরা ক্যানসার প্রতিরোধে প্রাকৃতিক কিছু খাবারের বিশেষ ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন:
সবুজ শাকসবজি: পালং শাক ও দেশীয় সবুজ শাকে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং বিশেষ এনজাইম থাকে, যা শরীরে টিউমার তৈরি হতে বাধা দেয় ও ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে সাহায্য করে।হলুদ: রান্নার অপরিহার্য মশলা হলুদে থাকা 'কারকিউমিন' নামক শক্তিশালী উপাদান শরীরকে ভেতর থেকে ক্যানসার প্রতিরোধী করে তোলে।টক দই ও দুগ্ধজাত খাবার: টক দইয়ের মতো প্রোবায়োটিক খাদ্য অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া বাঁচিয়ে রাখে। এছাড়া দুধের ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি কোলন ও স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়।তৈলাক্ত ও সামুদ্রিক মাছ: ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডে সমৃদ্ধ এই মাছগুলো অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি হিসেবে কাজ করে ক্যানসার রোধে ভূমিকা রাখে এবং কেমোথেরাপির শারীরিক ধকল সামলাতেও সাহায্য করে।গ্রিন টি: প্রতিদিন গ্রিন টি পানের অভ্যাস শরীরের ক্যানসার কোষ ছড়িয়ে পড়া (মেটাস্ট্যাসিস) আটকায়, কারণ এতে রয়েছে পলিফেনল ও ক্যাটেচিন।মাশরুম, বাদাম ও অলিভ অয়েল: নাস্তায় চিনাবাদাম, সালাদে এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল এবং পুষ্টিকর মাশরুম যুক্ত করলে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বাড়ে। অলিভ অয়েলে থাকা ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস প্রদাহ কমিয়ে শরীর সতেজ রাখে।ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তাজকেরা সুলতানা চৌধুরী জানান, ক্যানসার হওয়া মানেই জীবন শেষ নয়। প্রাথমিক অবস্থায় সচেতন হওয়া এবং দৈনন্দিন খাবারের থালায় পুষ্টিকর উপাদানের উপস্থিতি বজায় রাখলে এই মরণব্যাধিকে জয় করা সম্ভব।