এক সন্তানকে কবরে শুইয়ে এসে আরেক সন্তানের লাইফ সাপোর্টের শয্যাপাশে দিন কাটছে মোহাম্মদ কবিরের। চট্টগ্রামে হাম, ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১০ বছরের বড় ছেলে নূর মোহাম্মদ আরাফাতের মৃত্যুর পর ১০ মাস বয়সী ছোট ছেলে মোহাম্মদ আবু বক্কর ওরফে আরবও এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে শিশুটি।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নগরীর হিলভিউ পাবলিক স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল আরাফাত। প্রায় ১৫-২০ দিন আগে তার জ্বর, বমি ও কাশি শুরু হয়। প্রথমে সাউদার্ন হাসপাতালে দুই দিন ও পরে বেসরকারি ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। শ্বাসকষ্ট বাড়ায় তাকে ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের আইসিইউতে রাখা হয়েছিল। সেখানে আরাফাতের ফুসফুস ও যকৃতে মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয়। চিকিৎসা খরচ সামলাতে হিমশিম খেয়ে পরে ছেলেকে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করেন বাবা কবির।

গত বৃহস্পতিবার রাতেও আইসিইউতে শুয়ে বাবার ডাকে সাড়া দিয়ে নিজেকে ভালো আছে বলে জানিয়েছিল আরাফাত। কিন্তু শুক্রবার সকালে বাবার ওষুধ আনতে যাওয়ার ফাঁকেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। চিকিৎসকদের উপস্থিতিতেই মৃত্যু হয় তার। শুক্রবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরের মোমেনবাগ আবাসিক এলাকাসংলগ্ন কবরস্থানে আরাফাতকে দাফন করা হয়।

বড় ছেলেকে দাফন করার পরই কবির ছুটে যান হাসপাতালে থাকা ছোট ছেলে আবু বক্করের কাছে। চার দিন আগে মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা এই শিশুটিও হাম, ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। ভর্তির সময় সাড়ে সাত কেজি ওজন থাকা শিশুটি বর্তমানে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রয়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। তবে আশা ছাড়তে পারছেন না ৩১ বছর বয়সী বাবা কবির।

একদিকে সন্তান হারানোর শোক, অন্যদিকে চিকিৎসার বিপুল খরচে চরম সংকটে পড়েছেন কবির। ময়মনসিংহ জেলার বাসিন্দা কবির চট্টগ্রাম নগরের হিলভিউ এলাকার ১ নম্বর সড়কে পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে মাসে ২০ হাজার টাকা আয় করেন তিনি, যার মধ্যে বাসাভাড়াতেই চলে যায় ৬ হাজার টাকা। কেবল বড় ছেলের চিকিৎসার পেছনেই হাসপাতাল খরচ হয়েছে আড়াই লাখ টাকার বেশি। নিজের জমানো টাকা, সহকর্মী ও প্রতিবেশীদের সহায়তা এবং আত্মীয়দের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে সেই খরচ চালান তিনি।

সন্তানদের এই ভয়াবহ দুর্যোগে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন আরাফাতের মা আমেনা বেগম। তিনি বাসায় ক্রমাগত বড় ছেলেকে খুঁজছেন এবং বার বারবার সংজ্ঞা হারাচ্ছেন। বর্তমানে হাসপাতালে কবিরের পাশে থেকে সহায়তা করছেন তাঁর বৃদ্ধা মা। শনিবার বিকেলে হাসপাতালে কবির জানান, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকায় তিনি কোনো কিছু সঠিকভাবে হিসাব করতে পারছেন না এবং সব হারিয়ে দিশাহারা বোধ করছেন।