মানুষের তৈরি শব্দদূষণ কেবল মানব স্বাস্থ্যেই নয়, বন্য প্রাণী ও পক্ষীকুলের স্বাভাবিক জীবনেও ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনছে। সম্প্রতি সায়েন্স (Science) সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, শব্দদূষণের কারণে বিশ্বজুড়ে বন্য প্রাণীদের শারীরিক গঠন, আচরণগত বৈচিত্র্য, প্রজনন প্রক্রিয়া এবং খাদ্য সংগ্রহের স্বাভাবিক নিয়ম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্টের গবেষক হ্যান্সইয়র্গ পি. কুঙ্ক ও রুভেন শ্মিট বিশ্বের ছয়টি মহাদেশের স্থলজ ও জলজ পরিবেশের ওপর পরিচালিত ২১৪টি পরীক্ষামূলক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।

গবেষক দলটি ১৭৭টি প্রাণীপ্রজাতির শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, শারীরিক বিকাশ, আচরণ, প্রজনন ক্ষমতা এবং শিকারি ও শিকারের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর শব্দদূষণের প্রভাব গভীর মনোযোগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছেন। গবেষণার তথ্যানুযায়ী, অন্তর্ভুক্ত প্রজাতিগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশেরই কোনো না কোনো শারীরিক বা আচরণগত পরিবর্তন ঘটেছে। অতিরিক্ত শব্দের কারণে কোষীয় স্তরে তীব্র স্ট্রেস বা চাপের লক্ষণ দেখা দিচ্ছে, শরীরে হরমোনের মাত্রা বাড়ছে এবং স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশে অনিয়ম তৈরি হচ্ছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার গবেষণাতেও উচ্চগ্রামের শব্দের কারণে প্রাণীদের বধির হয়ে যাওয়ার ঝুঁকির কথা সামনে এসেছে।

শব্দদূষণের ফলে প্রাণীদের আত্মরক্ষা ও নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণের প্রাকৃতিক কৌশলে মারাত্মক জটিলতা তৈরি হচ্ছে। স্বাভাবিক নিয়মে শিকারি প্রাণীর উপস্থিতি টের পেলে ছোট প্রাণীরা আত্মরক্ষার্থে লুকিয়ে পড়ে। কিন্তু মানুষের তৈরি কৃত্রিম শব্দের কারণে অনেক সময় বদ্ধ স্থানে শব্দ প্রতিধ্বনি হয়ে বিভ্রান্তিকর পরিবেশের সৃষ্টি করে। এতে প্রাণীরা ভুল সংকেত পেয়ে নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে উন্মুক্ত স্থানে চলে আসে এবং সহজেই শিকারির খাদ্য পরিণত হয়। একইভাবে, শব্দদূষণ শিকারি প্রাণীদের জীবনকেও বিপাকে ফেলছে। কোলাহলের কারণে শিকারের অবস্থান ও গতিবিধি বোঝা কঠিন হয়ে পড়ায় শান্ত পরিবেশের তুলনায় শব্দযুক্ত এলাকায় শিকার ধরতে শিকারিদের প্রায় আড়াই গুণ বেশি শারীরিক প্রচেষ্টা চালাতে হয়, অথচ তাদের সাফল্যের হার উল্টো ২৫ শতাংশ কমে যায়।

প্রকৃতিতে শব্দদূষণের প্রভাব সব প্রজাতির ওপর সমানভাবে পড়ে না, যা খাদ্যজালের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে দিচ্ছে। কোনো প্রজাতি ব্যর্থ হলে সুযোগসন্ধানী অন্য কোনো প্রাণী পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে বিভ্রান্ত শিকারকে কাবু করে ফেলছে। এছাড়া শব্দদূষণ যুক্ত এলাকায় প্রাণীর উপস্থিতি বা ঘনত্ব শান্ত এলাকার তুলনায় প্রায় ৩৭ শতাংশ কমে যায়। অর্থাৎ, শান্ত পরিবেশে যদি ১০০টি প্রাণী বসবাস করে, তবে শব্দপূর্ণ এলাকায় তা নেমে আসে প্রায় ৬৩টিতে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বিভিন্ন প্রজাতি ও পক্ষীকুল সঠিক বাসস্থান নির্ধারণ, সঙ্গী খোঁজা, শিকারিকে ধোঁকা দেওয়া, সন্তান রক্ষা এবং চারণক্ষেত্র বা এলাকা সুরক্ষিত রাখার জন্য শব্দের সংকেতের ওপর সরাসরি নির্ভর করে। তবে ট্রাফিকের হর্ন, জাহাজের ইঞ্জিন কিংবা কলকারখানার বিকট আওয়াজ তাদের স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাহত করে মানসিক অবসাদ বাড়াচ্ছে এবং প্রজনন হ্রাসসহ বেঁচে থাকার ক্ষমতার মূলে আঘাত হানছে।

এই পরিস্থিতি থেকে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গবেষকরা কেবল বন্য প্রাণীর প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক 'অ্যাকুস্টিক এনভায়রনমেন্ট' বা স্বাভাবিক শব্দপরিবেশ বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। এজন্য সংবেদনশীল এলাকায় কম শব্দের অঞ্চল ঘোষণা, শিল্পকারখানা ও নৌযানের শব্দ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাণীদের জন্য শব্দমুক্ত নিরাপদ আশ্রয় বা 'অ্যাকুস্টিক রিফিউজ' গড়ে তোলার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক ও গবেষক মুস্তাকিম গিয়াসের তথ্য অনুযায়ী, সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত 'Echoes of the Anthropocene: Noise pollution as a global threat' শীর্ষ নিবন্ধটিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ সংরক্ষণ পরিকল্পনায় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

লেখক : মুস্তাকিম গিয়াস, বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক ও গবেষক Journal Reference: Hansjoerg P.