উচ্চশিক্ষায় ভর্তির পথ সুগম করতে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ দুই বিষয়ে অনুত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের জন্য আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে সম্পূরক পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই ইতিবাচক উদ্যোগের সুফল পাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। দেশের শীর্ষস্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্নাতকে ভর্তির প্রাথমিক আবেদন প্রক্রিয়া চলতি মাসেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ভর্তি কার্যক্রমের সময়সূচির সঙ্গে সম্পূরক পরীক্ষার ফলাফলের সঠিক সমন্বয় না থাকায় দ্রুত পরীক্ষা নেওয়ার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।
শিক্ষা বিভাগের সূত্র অনুযায়ী, সম্পূরক পরীক্ষার বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনা হলেও প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনাগ্রহের কারণে শিক্ষার্থীরা শতভাগ সুবিধা পাবেন না বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একজন কর্মকর্তা জানান, ফলাফল প্রকাশের মাত্র এক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো সম্পূরক পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে বলে কিছুটা ঘাটতি বা অসামঞ্জস্য থাকতে পারে। আগামী বছর থেকে সব বিশ্ববিদ্যালয়েই এই সুযোগ নিশ্চিত করা যাবে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন।
ফরম পূরণ ও উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশ নিয়েও এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির ঘোষণা অনুযায়ী, উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের ফলাফল প্রকাশ করা হবে ২৩ নভেম্বর। অথচ সম্পূরক পরীক্ষার জন্য চলমান ফরম পূরণের শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ নভেম্বর। এবার ১০ লাখের বেশি উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের আবেদন জমা পড়েছে। কোনো শিক্ষার্থী তিন বিষয়ে অকৃতকার্য হয়ে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করার পর ফলাফলে যদি এক বা দুই বিষয়ে পাস করেন, তবে তাঁর সম্পূরক পরীক্ষা দেওয়ার যোগ্যতা তৈরি হবে। কিন্তু ফরম পূরণ আগে শেষ হয়ে যাওয়ায় তাঁরা পরীক্ষার সুযোগ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। চট্টগ্রাম অঞ্চলের এক অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাঁর প্রতিবেশীর একাধিক সন্তান দুই বা তিন বিষয়ে অকৃতকার্য হয়ে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছেন। ফরম পূরণের নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পর ফল প্রকাশ হলে তাঁরা কীভাবে সম্পূরক পরীক্ষায় অংশ নেবেন, তা সরকারের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। এই বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক জেসমিন তাসলিমা বানূ জানান, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাপনাই থাকবে।
চলতি বছরের ৩১ অক্টোবর ঘোষিত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন। অন্যদিকে, চতুর্থ বিষয় বাদে সর্বোচ্চ দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন মোট ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে এক বিষয়ে অনুত্তীর্ণের সংখ্যা ২ লাখ ৯৮ হাজার ৪০ জন এবং দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৬৫ জন।
প্রথাগতভাবে পাবলিক পরীক্ষায় কোনো বিষয়ে অকৃতকার্য হলে পরবর্তী বছর পুরো এক বছরের অপেক্ষার পর পুনরায় পরীক্ষায় বসতে হতো। শিক্ষার্থীদের এই দীর্ঘ বিলম্ব এড়াতে এবার ফল প্রকাশের এক মাসের মধ্যেই নিয়মিত ও অনিয়মিত—উভয় ধরনের পরীক্ষার্থীদের জন্য এই বিশেষ সম্পূরক পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। ৫ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই ফরম পূরণ চলবে ৯ নভেম্বর পর্যন্ত এবং ফি জমা দেওয়া যাবে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত। এতে তত্ত্বীয় প্রতি পত্রের ফরম পূরণ ফি ১২৫ টাকা, ব্যবহারিক প্রতি পত্র ২৫ টাকা এবং পরীক্ষা কেন্দ্র ফি ৪ ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত ফি আদায় করলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে গত ৫ নভেম্বর এক নোটিশে সতর্ক করে দিয়েছে আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচি লক্ষ্য করলে সমন্বয়হীনতার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক প্রথম বর্ষে অনলাইনে ভর্তি আবেদন শুরু হচ্ছে ১১ নভেম্বর এবং তা চলবে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত। পাঁচটি ইউনিটের অধীনে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে; যার মধ্যে আইবিএ ইউনিটের পরীক্ষা ৫ ডিসেম্বর, বিজ্ঞান ইউনিটের পরীক্ষা ১২ ডিসেম্বর, কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটের ১৯ ডিসেম্বর, চারুকলা ইউনিটের সাধারণ জ্ঞান ও অঙ্কন পরীক্ষা ২২ ডিসেম্বর এবং ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটের পরীক্ষা ২৬ ডিসেম্বর নেওয়া হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, দুই বিষয়ে অনুত্তীর্ণদের দ্রুত পাসের সুযোগ দেওয়া বোর্ডের নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। আগে যেখানে একটি আসনের বিপরীতে প্রায় ৮০ জন পরীক্ষা দিতেন, এখন তা কমে ৬০ থেকে ৭০ জন হচ্ছে। তবে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯৫ থেকে ৯৬ শতাংশ পরীক্ষার্থীই পাসের প্রয়োজনীয় নম্বর পান না। তাই সম্পূরক পরীক্ষায় পাস করে এসে ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা কতটুকু সুবিধা করতে পারবেন, তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।
একইভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি আবেদন ১২ নভেম্বর শুরু হয়ে শেষ হবে ২৭ নভেম্বর। সেখানে ‘বি’, ‘সি’ ও ‘এ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা যথাক্রমে আগামী বছরের ৮, ৯ ও ১৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি আবেদন চলবে ১৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। অন্যদিকে বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা আগামী ১৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা কমিটির প্রধান অধ্যাপক কামরুল হাসান জানান, ২০ তারিখের পর একাডেমি কাউন্সিলের অনুমোদনের মাধ্যমে আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। বুয়েট সব সময়ই পুনর্নিরীক্ষণের ফল পর্যন্ত অপেক্ষা করে। তবে বুয়েটে সীমিতসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাওয়ায় সম্পূরক পরীক্ষার্থীদের সেই সুযোগ পাওয়ার সুযোগ নেই বলেই ইঙ্গিত দেন তিনি। ফলে এসব প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূরক পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই আবেদনের সময়সীমা পার হয়ে যাবে।
ইউজিসির তথ্যমতে, দেশে উচ্চশিক্ষায় প্রায় ১৪ লাখ ৯২ হাজার আসন রয়েছে। এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও এর অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানে ১০ লাখের বেশি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ৪ লাখের বেশি আসন রয়েছে। সেই হিসেবে উত্তীর্ণ সকল শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও ৮ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি আসন ফাঁকা থাকবে। তাই আসন খালি থাকা সত্ত্বেও সমন্বয়হীনতার কারণে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার যোগ্যতা হারাচ্ছেন।
এ বিষয়ে আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, সরকারের সদিচ্ছা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সেশনজটের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই এক মাসের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকা বা বুয়েটের মতো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পূরক পরীক্ষার্থীদের সুযোগ না দিলেও দেশে বহু বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ রয়েছে, যেখানে এই শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে পারবেন। তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদরা মনে করেন, দ্রুত পরীক্ষা নেওয়ার এই উদ্যোগের পূর্ণ সুফল পেতে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে দ্রুত সময়সূচির সঠিক সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।
এ ছাড়া পরীক্ষাকেন্দ্র ফি ৪৫০ টাকা।এদিকে পরীক্ষার ফরম পূরণের নামে কোনো পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায় করা যাবে না বলে নির্দেশনা দিয়েছে আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি।