জিয়াউর রহমান: অমর ও মৃত্যুঞ্জয়ী
লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান (১৯৩৬-১৯৮১) বাংলাদেশের ইতিহাসে ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক ক্যারিয়ারজুড়ে রয়েছে নানা রোমাঞ্চকর ঘটনা এবং ইতিহাসের ঘটনাবহুল বর্ণনা। ইতিহাস ও আপন মহিমায় তিনি সমুজ্জ্বল। সৈনিক জীবন, মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বগাঁথা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান আজও অনস্বীকার্য।
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত হন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রচলন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করেন। তাঁর দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা আজও সমানভাবে অনুভূত হয়।
বিশেষ করে, বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর জাতীয় পরিচয় নিয়ে যখন এক ধরনের দ্বিধা ও উত্তেজনা বিরাজ করছিল, তখন তিনি দীপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেন ”বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ”। ফলে, তাঁর কর্মজীবন এবং রাষ্ট্রীয় শাসন পর্যালোচনার মাধ্যমে তাঁর দর্শন সম্পর্কে ধারণা লাভ করা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
তরুণ বয়স থেকেই অবদমিত দেশপ্রেম
বাংলা অঞ্চলে বাঙালিদের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিজয় মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছাত্র ও চাকরি জীবন থেকেই উদযাপন করতেন। তাঁর লিখিত ‘একটি জাতির জন্ম’ প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেছিলেন:
”১৯৫৪ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হল নির্বাচন। যুক্তফ্রন্টের বিজয় রথের চাকার নিচে পিষ্ট হল মুসলিম লীগ। বাঙালিদের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক যুক্তফ্রন্টের বিজয় কেতন উড়ল বাংলায়। আমি তখন দ্বিতীয় পর্যায়ের ক্যাডেট। আমাদের মনেও জাগল তখন পুলকের শিহরণ।… পর্বত ঘেরা অ্যাবোটাবাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমরা বাঙালি ক্যাডেটরা আনন্দে হলাম আত্মহারা। একাডেমি ক্যাফেটেরিয়ায় নির্বাচনী বিজয় উৎসব করলাম আমরা। এ ছিল আমাদের বাংলা ভাষার জয়। এ ছিল আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার জয়, এ ছিল আমাদের জনগণের, আমাদের দেশের একটি বিরাট সাফল্য।”
এই ঐতিহাসিক স্মৃতিচারণ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, তরুণ বয়স থেকেই তাঁর মধ্যে গভীর দেশপ্রেম এবং পূর্ববঙ্গে বাঙালিদের একটি আলাদা জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা তীব্র ছিল।
জনমানুষের নেতা ও শফিক রেহমানের মূল্যায়ন
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক শফিক রেহমান ২০২৫ সালে প্রকাশিত তাঁর “রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান” গ্রন্থে লিখেছেন:
‘জিয়া সত্যিই ছিলেন এক মৃত্যুঞ্জয়ী ব্যক্তি। তাঁর আদর্শ ও লক্ষ্য ছিল বাস্তবমুখী। তাই জনতার কাছে বিএনপি’র আবেদন এখন আরো বেশি।’
বাংলাদেশের ইতিহাসে যে কয়েকজন ব্যক্তিত্ব সর্বজনীন জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন, তাঁদের মধ্যে জিয়াউর রহমান অন্যতম। মৃত্যুর ৪৪ বছর পরও তাঁর ব্যক্তিত্বের মোহ ও জনপ্রিয়তা কমেনি। গণভোটের আয়োজন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য উন্মুক্ত রাজনৈতিক কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের দ্বার উন্মোচন করেছিলেন তিনি।
যুগান্তকারী ‘১৯ দফা কর্মসূচি’ ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নীতি ও কর্মসূচির মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও যুগান্তকারী হলো তাঁর ‘১৯ দফা কর্মসূচি’। দেশের আর্থ-সামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে ঘোষিত এই ১৯টি দফা ছিল মূলত একটি আধুনিক বাংলাদেশের রূপরেখা:
-
সার্বভৌমত্ব ও আদর্শ: দেশের স্বাধীনতা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি সর্বাত্মক বিশ্বাস ও আস্থা রাখা।
-
গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার: জাতীয় জীবনে গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের সর্বাত্মক প্রতিফলন।
-
অর্থনীতি ও অবকাঠামো: আত্মনির্ভরশীল জাতি গঠন, গ্রামীণ ও জাতীয় অর্থনীতি জোরদারকরণ, এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারি খাতকে উৎসাহ প্রদান।
-
মৌলিক চাহিদা: খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, কাপড়ের উৎপাদন বৃদ্ধি, গৃহহীনদের আবাসন ব্যবস্থা, নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং চিকিৎসার সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
-
সামাজিক সমতা: সমাজে নারীর যথাযোগ্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং যুবসমাজকে জাতি গঠনে উদ্বুদ্ধকরণ।
-
শ্রমিক ও প্রশাসন: সুস্থ শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং সরকারি কর্মচারীদের দেশ গঠনের মনোভাব তৈরিতে উৎসাহিত করা।
-
পররাষ্ট্রনীতি: সকল দেশের সাথে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব এবং মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করা।
-
স্থানীয় সরকার ও সুশাসন: ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ কায়েম এবং ধর্ম, গোত্র ও বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের অধিকার রক্ষা করে জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করা।
এই ১৯ দফার বেশ কিছু ধারা বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্র ও জনগণের সদিচ্ছার ওপর ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সমৃদ্ধি নির্ভর করছে, যেখানে এই নীতিগুলো বাস্তবায়নে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
৭ নভেম্বরের সিপাহী বিপ্লব: ইতিহাসের এক ‘ওয়েলকাম রিলিফ’
সিপাহী বিপ্লব জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবনে একটি টার্নিং পয়েন্ট। ড. আবদুল লতিফ মাসুম ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘জিয়াউর রহমান- আচ্ছাদিত ইতিহাস’ গ্রন্থে এই পটপরিবর্তনকে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি লিখেছেন:
”একটি political disaster (রাজনৈতিক দুর্যোগ) থেকে মুক্তির জন্য জনগণ মনস্তাত্ত্বিকভাবে একটি শক্তিশালী সরকারের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়বে এটাই ‘রাজনৈতিক ব্যাকরণের’ দাবি। আর মিলিটারি পলিটিক্স সম্পর্কে আধুনিক দুনিয়ার জনপ্রিয় লেখক এডওয়ার্ড ফিয়েট ঠিক এই অবস্থাকে জনগণের জন্য ‘Welcome Relief’ বলে বর্ণনা করেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট প্রক্রিয়ায় ৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী বিপ্লব ছিল এমনি ধরনের একটি ওয়েলকাম রিলিফ।”
এই বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণ সব অনিশ্চয়তা ও বিদেশি ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে একজন দৃঢ়চেতা মানুষের হাতে দেশের হাল তুলে দিয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, সিপাহী বিপ্লব সমসাময়িক পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ছিল ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে, আর ১৯৭৫ সালের বিপ্লব ছিল স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য। সাধারণ সৈনিকরা যেভাবে শৃংখলার ব্যারিকেড ভেঙে জীবন বাজি রেখে এই বিপ্লব সফল করেছিল, তা রাজনীতি বিজ্ঞানের প্রচলিত অভ্যুত্থানের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
বহুমাত্রিক সংস্কার ও শেষ বিদায়
জিয়াউর রহমানের সংক্ষিপ্ত শাসনামলে সংবিধানের সংশোধন, মিশ্র অর্থনৈতিক নীতি, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নগরবাসীর জন্য কল্যাণমুখী কর্মসূচি, শ্রমজীবীদের অধিকার রক্ষা, ইসলামী মূল্যবোধের প্রসার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে এক আমূল পরিবর্তন আসে।
১৯৮১ সালের আজকের এই দিনে (৩০ মে) চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। যদিও তাঁর এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে আজও অনেক রহস্য উন্মোচিত হয়নি এবং বহু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি—যা নিয়ে আরও গভীর গবেষণা ও বিচার-বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
জিয়াউর রহমানের অবর্তমানে বাংলাদেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণের একমাত্র উপায় হলো তাঁর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা ও দর্শনকে ধারণ করা। তাঁর জানাজায় অংশ নেওয়া লাখো মানুষের ঢল এবং আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে তাঁর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রমাণ করে—জিয়াউর রহমান ইতিহাসে অমর ও মৃত্যুঞ্জয়ী।
লেখক পরিচিতি:
-
মো. হাবিবুর রহমান: কবি, লেখক ও গবেষক।
-
মামদুদুর রহমান: লেখক ও তথ্যবিজ্ঞানী।