বর্গা চাষীর ঘরে ঈদের আনন্দ: নেপথ্যে সততা ও হাড়ভাঙা খাটুনি
শহীদুল ইসলাম শরীফ, স্টাফ রিপোর্টার :
নিজের কোনো জমি নেই, নেই মাথা গোঁজার স্থায়ী ঠিকানাও। কিন্তু বুকে আছে হাড়ভাঙা খাটুনি আর সততার জোর। এই সততার ওপর ভর করেই সাফল্যের এক নতুন গল্প বুনেছেন মোহাম্মদ হোসেন। চলতি মৌসুমে ঢাকার দোহার উপজেলার জামালচর গ্রামে অন্যের তিন বিঘা জমি বর্গা নিয়ে ধান চাষ করে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন এই সংগ্রামী কৃষক।
অভাবের তাড়নায় কুড়িগ্রাম থেকে দোহারে
মোহাম্মদ হোসেনের স্থায়ী বাড়ি দোহারে নয়। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলায়। সেখানে নিজের জমিজমা না থাকায় এবং চরম অভাব-অনটনের কারণে বাধ্য হয়ে প্রায় চার বছর আগে পরিবার নিয়ে দোহারে পাড়ি জমান। প্রথমে দিনমজুর হিসেবে কাজ করলেও, পরবর্তীতে তিনি অন্যের জমি বর্গা নিয়ে পুরোদমে চাষাবাদ শুরু করেন।
মাঠে ফিরল গ্রাম বাংলার পুরোনো ঐতিহ্য
ধান কাটার এই ব্যস্ত মৌসুমে মাঠে কথা হয় হোসেন আলীর স্ত্রী বেগম খাতুনের সাথে। তিনি স্বামী ও অন্য দিনমজুরদের জন্য বাড়ি থেকে সকালের নাস্তা নিয়ে এসেছেন মাঠে। যান্ত্রিকতার যুগে গ্রাম বাংলার এই চিরচেনা ঐতিহ্য এখন খুব কমই চোখে পড়ে। জামালচরের মাঠে হোসেন ও তাঁর স্ত্রীর এই মেলবন্ধন যেন সেই পুরোনো ঐতিহ্যকেই আবার মনে করিয়ে দিল।
সরকারি সহায়তা ও অভাবনীয় সাফল্য
চলতি মৌসুমে মাত্র ১৫,০০০ টাকা পুঁজি নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন মোহাম্মদ হোসেন। তবে তাঁর এই লড়াইয়ে বড় সহায় হয়ে দাঁড়ায় স্থানীয় কৃষি বিভাগ।
-
সরকারি প্রণোদনা: উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে তিনি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্নত জাতের ব্রি-১০১ ধানের বীজ, সার ও প্রয়োজনীয় কীটনাশক সহায়তা পান।
-
বাম্পার ফলন: কৃষি বিভাগের সঠিক পরামর্শ এবং দিনরাত কঠোর পরিশ্রমে ৩ বিঘা জমি থেকে তিনি প্রায় ৮৫ মণ ধান ঘরে তুলেছেন।
-
স্বীকৃতি: অনন্য এই সাফল্যের জন্য কিছুদিন আগে দোহার উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে তাঁকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা হয়।
কাটবে কষ্টের দিন, ঘরে ফিরল ঈদের খুশি
ঈদুল আজহার ঠিক আগমুহূর্তে ঘরে বিপুল পরিমাণ ধান আসায় মোহাম্মদ হোসেনের পরিবারে এখন আনন্দের বন্যা। যেখানে একসময় দু-মুঠো ভাতের জোগান করতেই হিমশিম খেতে হতো, সেখানে এই ধানের আয় দিয়ে এখন ঈদের আনন্দ মেটানো এবং সারা বছরের খোরাকি জোগান দেওয়া সম্ভব হবে।
হাসিমুখে হোসেন বলেন, “কৃষি অফিসের স্যারেরা আমারে বীজ, সার আর বুদ্ধি দিয়া অনেক উপকার করছে। ১৫ হাজার টাকা খরচ কইরা ৮৫ মণ ধান পামু, এইডা ভাবতেও পারি নাই। এইবার পরিবার নিয়া অন্তত শান্তিতে ঈদ করবার পারমু।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, মোহাম্মদ হোসেনের মতো হাজারো বর্গা চাষি দেশের কৃষি খাতকে সচল রাখছেন। সঠিক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে যে কৃষিতে এমন বিপ্লব ঘটানো সম্ভব— হোসেন আজ তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।