২০১৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ফিফা সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর মেয়াদকাল জুড়ে একের পর এক বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না। ১০ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, আগামী বছর পরবর্তী ফিফা সভাপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবং ইনফান্তিনো আবারও সেই নির্বাচনে অংশ নেবেন। প্রশ্ন উঠেছে, ফিফাকে ঘিরে চলমান বিতর্কগুলো কি তার জন্য বড় ধাক্কা হতে চলেছে? কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, বিতর্কের পাহাড় ডিঙিয়েও ইনফান্তিনো তার পদ ধরে রাখতে সক্ষম হবেন, কারণ তার জয় নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ভোট ইতিমধ্যেই তার ঝুলিতে রয়েছে।
ইনফান্তিনোর বিতর্কিত মেয়াদের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হলো যুক্তরাষ্ট্রের ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা। বিশ্বকাপের নিয়ম অনুযায়ী, লাল কার্ডের বিরুদ্ধে কোনো আপিলের সুযোগ নেই এবং সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়কে পরবর্তী ম্যাচে ডাগআউটেই থাকতে হয়। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ফোন কলের পর সবকিছু বদলে যায়। বালোগানের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পর ফিফা ৮৭১ শব্দের একটি বিবৃতি প্রকাশ করলেও, কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছিল না। পরবর্তীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই মন্তব্য করেন, ‘আমিই তাদের দিয়ে এটা করিয়েছি’, যখন তাকে ইনফান্তিনোকে ফোন করার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়। যদিও ইনফান্তিনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে দাবি করেন, ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি স্বাধীনভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে সাধারণ মানুষ এই বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখছেন। তাদের মতে, এই সিদ্ধান্তের সুবিধা অন্য কোনো দল নয়, বরং স্বাগতিক দেশ পেয়েছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ট্রাম্প—যিনি ইনফান্তিনোকে নিজের ‘বন্ধু’ বলে ডাকেন। ফলে এই নিষেধাজ্ঞা বাতিলের ঘটনাটি অনেকটা রাষ্ট্রপতির ক্ষমা ঘোষণার মতোই মনে হয়েছে। ফিফার নিয়মকানুন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট এবং এতে কোনোভাবেই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অনুমতি নেই। জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোতে সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে পাকিস্তান গত আট বছরে তিনবার আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু ইনফান্তিনো ও ট্রাম্পের ক্ষেত্রে যেন নিয়মগুলো বদলে যায়।
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ দেওয়ার ঘটনাটিও সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে এই পুরস্কার দেওয়া হলে অনেকে এটিকে ‘দুই বন্ধুর ভালোবাসার ফল’ বলে অভিহিত করেন এবং দাবি করেন যে ট্রাম্পের জন্যই প্রথমবার এই পুরস্কার চালু করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ‘ফেয়ারস্কয়ার’ গত ডিসেম্বরে ফিফার নৈতিক কমিটির কাছে অভিযোগ করে জানায়, ইনফান্তিনো এই পুরস্কার তৈরি করে ফিফার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নিয়ম লঙ্ঘন করেছেন। কিন্তু সেই অভিযোগের কোনো জবাব মেলেনি। এরপর গত মাসে ৫০ জন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য নৈতিক কমিটিকে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে নতুন একটি চিঠি পাঠান, যারও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্প বিশ্বকাপের একটি ম্যাচও মাঠে বসে দেখেননি, অথচ বালোগানের ঘটনার পুরো কৃতিত্ব তিনি নিজেই নিয়েছেন। এর আগে সোমালিয়ান রেফারি ওমর আরতানের ক্ষেত্রেও একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। ২০২৫ সালে আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের (কাফ) বর্ষসেরা পুরুষ রেফারি নির্বাচিত হওয়া আরতানকে মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনা নিয়ে ইনফান্তিনো রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘আরে ভাই, শান্ত থাকুন, রিল্যাক্স করুন’, যা অনেকের মনে ফিফার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সন্দেহ তৈরি করে।
২০৩০ ও ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজক নির্ধারণের প্রক্রিয়াটিও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ফিফা সিদ্ধান্ত নেয় যে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ তিনটি মহাদেশে (আফ্রিকা, ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকা) আয়োজন করা হবে। এর ফলে ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন করার সুযোগ পাবে শুধু এশিয়া বা ওশেনিয়া অঞ্চলের কোনো দেশ। কার্যত, কোনো প্রতিযোগী না থাকায় এই নিয়মের কারণে পরোক্ষভাবে সৌদি আরবের বিশ্বকাপ আয়োজন নিশ্চিত হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, ইনফান্তিনোর আমলে সৌদি আরব ও ফিফার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণেই সৌদি এই সুযোগ পেয়েছে। নরওয়ের ফুটবল ফেডারেশন এই প্রক্রিয়ায় ভোট দেয়নি, কারণ তাদের যুক্তি ছিল, এই আয়োজক খোঁজার প্রক্রিয়াটি ফিফার ‘ভালো শাসনের সংস্কারকে বাধা দিয়েছে এবং ফিফার ওপর মানুষের বিশ্বাসকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।’
ক্লাব বিশ্বকাপের বিষয়টিও সমালোচিত হয়েছে। ক্লাব ফুটবলের বিশাল আয়ের একটি অংশ নিজেদের করে নিতে ফিফা এই টুর্নামেন্টটি চালু করেছে, যা ফুটবলাররা একদমই চাননি। ফুটবলারদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘ফিফপ্রো’-এর সভাপতি সার্জিও মার্চি গত বছর বলেছিলেন, এই টুর্নামেন্টটি তৈরি করা হয়েছে কোনো আলোচনা ছাড়াই।
উয়েফা বালোগানের সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে গত মঙ্গলবার বলেছে, ফিফা এখানে ‘সব সীমা লঙ্ঘন করেছে’ এবং এটিকে ‘নজিরবিহীন বোধগম্যতাহীন ও অন্যায় সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করেছে। উয়েফা এবারই প্রথম ফিফার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, তা নয়। ২০২৫ সালের মে মাসে উয়েফা সভাপতি আলেক্সান্ডার সেফেরিনের নেতৃত্বে একদল ইউরোপীয় প্রতিনিধি ফিফা কংগ্রেসের একটি বিরতির সময় সভাকক্ষ থেকে ওয়াকআউট করেন। ইনফান্তিনো তখন ট্রাম্পের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের এক কূটনৈতিক সফর শেষে ২ ঘণ্টা ১৭ মিনিট দেরিতে সভায় এসেছিলেন।
চলমান বিশ্বকাপেও উয়েফা কিছু চাল চালার চেষ্টা করেছে। গত মাসে সোমালি রেফারি আরতান দেশে ফেরার পরপরই উয়েফা ঘোষণা করে, আগামী ১২ আগস্ট পিএসজি ও অ্যাস্টন ভিলার মধ্যকার উয়েফা সুপার কাপ ম্যাচটি পরিচালনার জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তা ছাড়া বছরজুড়েই উয়েফা বেশ জোর দিয়ে প্রচার করছে যে বিশ্বকাপের তুলনায় ইউরো ২০২৮-এর টিকিটের দাম কত কম। এমনকি তারা ম্যাচে কোনো হাইড্রেশন ব্রেক কিংবা মুখ চেপে ধরা খেলোয়াড়দের লাল কার্ড দেওয়ার মতো নিয়ম চালু করবে না। ইনফান্তিনো নিজেই উয়েফা থেকে উঠে এসেছেন এবং সংস্থাটির সেক্রেটারি জেনারেল পদে দীর্ঘদিন ছিলেন। চ্যাম্পিয়নস লিগে ড্র অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন। তিনি হয়তো পুরোপুরি সেখানে অবাঞ্ছিত নন, গত ফেব্রুয়ারিতেও তিনি উয়েফা কংগ্রেসে বক্তৃতা দেন। তবে দুই পক্ষের মধ্যে স্পষ্ট বিরোধ এখন দৃশ্যমান।
তবে এত বিতর্কের পরও ইনফান্তিনোর অবস্থান কি সত্যিই নড়বড়ে হয়ে পড়েছে? না, বিশ্বের অনেক ফুটবল ফেডারেশনের কাছে ইনফান্তিনো এখনো দারুণ জনপ্রিয়। এর বড় কারণ হলো ফুটবলের উন্নয়নে ফিফার ভূমিকা। ইনফান্তিনোর ‘ফিফা ফরোয়ার্ড’ কর্মসূচি বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ফুটবল প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে এবং বিশ্বকাপের পরিধি বাড়িয়ে তিনি অনগ্রসর দেশগুলোর জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছেন। এবার যেমন বিশ্বকাপে আরও ১৬টি বাড়তি দেশ অংশ নিতে পেরেছে, যার সিংহভাগই এসেছে কম শক্তিশালী কনফেডারেশনগুলো থেকে। ইউরোপ এই বাড়তি জায়গাগুলোর মধ্যে মাত্র ৩টি আসন পেয়েছে। ইনফান্তিনো এমন সব দেশকে স্বপ্ন ও আশা দেখিয়েছেন, যারা আগে কখনো বিশ্বকাপে খেলার কথা ভাবতেও পারত না—যেমন কেপ ভার্দে, কুরাসাও, জর্ডান ও উজবেকিস্তান। ৪৮ দলের এই ফরম্যাট নিয়ে যতই সমালোচনা হোক না কেন, এটি কেপ ভার্দের মতো দেশকে তাদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ করেছে এবং ঐতিহ্যগতভাবে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোকে তাদের খেলার মান বাড়াতে সাহায্য করবে, যা বিশ্ব ফুটবলের জন্য অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক।
বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্ট এবং এর টিকিটের চড়া দাম থেকেই মূলত এই প্রকল্পগুলোর খরচ মেটানো হয়। চলতি বছরে ফিফা প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার আয় করবে বলে আশা করা হচ্ছে। উয়েফা হয়তো ফিফা ও ইনফান্তিনোর অনেক নীতির বিরোধিতা করে, কিন্তু উয়েফা নিজেই অনেক ধনী এবং নিজেদের অর্থায়ন তারা নিজেই করতে পারে। কিন্তু বিশ্বের বাকি দেশগুলো ইনফান্তিনো ও ফিফার তৈরি করা এই আয়ের ওপরই অনেকাংশে নির্ভরশীল। ফিফার অধীনে মোট ২১১টি দেশ রয়েছে। সভাপতির নির্বাচনে প্রতিটি দেশের একটি করে ভোট দেওয়ার অধিকার আছে এবং জেতার জন্য ১০৬টি ভোটের প্রয়োজন হয়।
গত এপ্রিলে দক্ষিণ আমেরিকান কনফেডারেশন (কনমেবল) জানায়, তাদের ১০টি দেশই ইনফান্তিনোকে সমর্থন করবে। এর তিন সপ্তাহ পর আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (ক্যাফ) তাদের ৫৪টি সদস্যদেশের পক্ষ থেকে ইনফান্তিনোকে পূর্ণ সমর্থনের কথা নিশ্চিত করে। এর পরপরই এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের ৪৭টি দেশও একই পথ অনুসরণ করে। অর্থাৎ, ইনফান্তিনোর ঝুলিতে ইতিমধ্যেই ১০ + ৫৪ + ৪৭ = ১১১টি ভোট নিশ্চিত হয়ে আছে। এই পরিস্থিতিতে তাকে হারানো অসম্ভব বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আরতানের দুর্দশা নিয়ে ইনফান্তিনো রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘আরে ভাই, শান্ত থাকুন, রিল্যাক্স করুন।’.দুই বছর আগে ২০৩০ ও ২০৪০ সালের বিশ্বকাপ আয়োজক নির্ধারণের অদ্ভুত প্রক্রিয়াটির দিকে নজর দেওয়া যাক।