ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর দিকে তাকালে গত কয়েক বছরে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—এদের জৌলুশ আগের তুলনায় কমেছে। শুধু ব্যবসায়িক মডেলে টান পড়েছে তা নয়, একসময়ের বিশ্বস্ত ব্যবহারকারীরাও দলে দলে এসব প্ল্যাটফর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। বর্তমানে এই প্ল্যাটফর্মগুলো মূলত অ্যালগরিদম, এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট ও বটের দখলে চলে গেছে। ব্যবহারকারীদের আচরণেও এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন; আগে মানুষ যেখানে নিজেদের জীবনের গল্প বা ছবি স্বাধীনভাবে শেয়ার করত, এখন তারা সেখানে কেবল নিষ্ক্রিয় দর্শক হিসেবে যন্ত্রের তৈরি ফিড স্ক্রল করে যাচ্ছেন। মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, রাজনৈতিক কারসাজি ও নজরদারির ভয়ে মানুষ এখন ছোট ও ব্যক্তিগত ডিজিটাল পরিসরে আশ্রয় খুঁজছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিহাস বেশ পুরোনো। আশির দশক ও নব্বইয়ের দশকে কম্পিউটারের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কম্পিউসার্ভ, আমেরিকা অনলাইন বা প্রডিজির মতো সার্ভিসের মাধ্যমে ডিজিটাল যোগাযোগের সূচনা হয়। আধুনিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যাত্রা শুরু হয় ২০০২ সালে ফ্রেন্ডস্টারের হাত ধরে, যার ব্যবহারকারী এক বছরের মাথায় ৩০ লাখে পৌঁছায়। ২০০৩ সালে লিংকডইন ও মাইস্পেস আসে এবং ২০০৬ সালের মধ্যে মাইস্পেস গুগলের পরেই বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ওয়েবসাইট হয়ে ওঠে। ২০০৮ সালের দিকে ফেসবুক মাইস্পেসকে হটিয়ে রাজত্ব দখল করে। নিউজ ফিড ও লাইক বাটনের মাধ্যমে ফেসবুক মানুষকে জীবন্ত ও ব্যক্তিগত ডিজিটাল কমিউনিটি উপহার দেয়। টুইটার বিশ্বকে একটি গ্লোবাল আড্ডার জায়গা বানিয়ে দিয়েছিল, যেখানে কোনো বিরক্তিকর বিজ্ঞাপন, রাজনৈতিক মেরুকরণ বা অ্যালগরিদমের বাড়াবাড়ি ছিল না। সমাজবিজ্ঞানীদের জন্য এটি ছিল মানুষের আচরণ ও যোগাযোগের বিশাল ডেটাবেজ।
তবে ২০০৮ সালের পর থেকে প্রাইভেসি বা ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে সংকট শুরু হয়। মানুষের তৈরি কনটেন্টের জায়গা দখল করে নেয় অ্যালগরিদমের সাজানো ফিড, ইনফ্লুয়েন্সার, ব্র্যান্ড প্রমোশন ও জোর করে চাপিয়ে দেওয়া বিজ্ঞাপন। আমস্টারডাম ইউনিভার্সিটির কম্পিউটেশনাল সোশ্যাল সায়েন্সের সহকারী অধ্যাপক পিটার টর্নবার্গের মতে, এই পতনের পেছনে অ্যালগরিদমের বড় দায় রয়েছে। অ্যালগরিদম বুঝতে পারে যে মানুষ বিরক্ত বা ক্ষুব্ধ হলে বেশি রিঅ্যাক্ট করে, তাই তারা উসকানিমূলক কনটেন্ট ছড়িয়ে সমাজে বিভাজন তৈরি করে। এই নেতিবাচক পরিবেশ ও সাইবার বুলিংয়ের ভয়ে সাধারণ মানুষ কথা বলা কমিয়ে দিয়েছে। টিকটক ও স্ন্যাপচ্যাটের মতো অ্যাপগুলো মানুষকে শর্ট-ভিডিওর নেশায় বুঁদ করে নিষ্ক্রিয় দর্শকে পরিণত করেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মেটা ২০২১ সালের পর থেকে নিজেদের আর সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি বলে দাবিই করে না।
পিটার টর্নবার্গের গবেষণায় দেখা যায়, সমস্যাটি কেবল অ্যালগরিদম বা মানুষের স্বভাবের নয়, বরং মাধ্যমগুলোর মূল কাঠামোর ভেতরেই লুকিয়ে আছে। সোশ্যাল মিডিয়াকে প্রায়ই ‘ইকো চেম্বার’ বলা হলেও, টর্নবার্গের মতে, বাস্তব জীবনের চেয়ে অনলাইনেই মানুষ ভিন্নমতের মানুষের মুখোমুখি বেশি হয়। সমস্যা হলো, রাজনীতি বা সমাজ নিয়ে আমাদের ধারণা যুক্তির চেয়ে পরিচয়, আবেগ ও সাংস্কৃতিক পছন্দের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ২০২২ সালের গবেষণায় দেখা যায়, সোশ্যাল মিডিয়া মানুষকে স্থানীয় গণ্ডি থেকে বের করে জাতীয় বা বৈশ্বিক বিতর্কের মুখে ঠেলে দেয়, যেখানে মতের অমিল মানেই শত্রুতা। এই মেরুকরণ নব্বইয়ের দশকের কেবল টেলিভিশনের যুগে শুরু হলেও সোশ্যাল মিডিয়া একে উসকে দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনটি পথের কথা বলেছেন টর্নবার্গ। প্রথমত, মানুষ পাবলিক প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে হোয়াটসঅ্যাপ, ডিসকর্ড বা ইনস্টাগ্রামের প্রাইভেট গ্রুপ চ্যাটের দিকে ঝুঁকছে এবং সাবস্ট্যাকের মতো প্ল্যাটফর্মে বিশ্বস্ত লেখকদের লেখা পড়ছে। দ্বিতীয়ত, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম রিলস বা ফেসবুকের ভিডিওর মতো শর্ট-ভিডিওর রাজত্ব চলতেই থাকবে। তৃতীয়ত, জেনারেটিভ এআই বা চ্যাটবটগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়ছে, যেখানে মানুষ অন্য মানুষের চেয়ে এআইয়ের সঙ্গেই বেশি কথা বলছে। তবে টর্নবার্গ সতর্ক করে বলেছেন, প্রাইভেট গ্রুপগুলো ভবিষ্যতে সত্যিকারের ইকো চেম্বারের কারখানা হয়ে উঠতে পারে। আমরা এখন তথ্যপ্রযুক্তির এমন এক মৌলিক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যার প্রভাব ইন্টারনেট আবিষ্কারের মতোই যুগান্তকারী। এই পরিবর্তনের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার উপায় নেই, তাই সচেতন হওয়া ছাড়া আপাতত কোনো বিকল্প নেই।