রাজধানীর মোহাম্মদপুরের মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ারে অবস্থিত ছয়টি হাসপাতাল-ক্লিনিক ও একটি ব্লাড ব্যাংকসহ একাধিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান অভিযানের মাধ্যমে বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার মাত্র তিন মাসের মধ্যেই ফের পুরোদমে কার্যক্রম শুরু করেছে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ১০ শয্যার একটি ক্লিনিক পরিচালনার জন্য চিকিৎসক, পোস্ট-অপারেটিভ রুম, লেবার রুম, নার্স স্টেশন, স্টেরিলাইজেশন রুম, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অপেক্ষমাণ কক্ষসহ অন্তত ১৩ ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। ভুয়া চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞের অনুপস্থিতি, অনুমোদনহীন আইসিইউ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবসহ নানা গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে গত মার্চ মাসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল। একই সময়ে চানখাঁরপুলের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে সেগুলোর অধিকাংশই আগের মতোই নির্বিঘ্নে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এসব প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর অবৈধভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে, তবুও নবায়ন ছাড়াই রোগী ভর্তি, অস্ত্রোপচার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম চলছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠানে নেই বিএমডিসি নিবন্ধিত চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স কিংবা মানসম্মত রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি। মোহাম্মদপুরের মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ারে গিয়ে দেখা যায়, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালসহ আশপাশের সরকারি হাসপাতাল থেকে দালালের মাধ্যমে রোগী এনে বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হচ্ছে। অনকলে চিকিৎসক ডেকে রোগী দেখানো হচ্ছে। যমুনা হাসপাতাল ও রয়েল মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালের লাইসেন্সের মেয়াদ ২০২৪ সালের জুনে শেষ হলেও তা নবায়ন করা হয়নি। মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ারের এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে ২০২১ সালেও অভিযান চালিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। নানা অনিয়মের কারণে সে সময়েও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
গত ২৩, ২৪ ও ২৫ মার্চ স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের নির্দেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মিরপুর রোড ও মোহাম্মদপুরের ডক্টরস কেয়ার, টিজি মাল্টি স্পেশালাইজড হাসপাতাল, চানখাঁরপুলের আহমেদ স্পেশালাইজড হাসপাতাল ও অথেনটিক হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছিল। এছাড়া যমুনা হাসপাতাল ও প্রাইম অর্থোপেডিক হাসপাতালের আইসিইউ ও এনআইসিইউ সেবা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অভিযানে প্যাথলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চরম ঘাটতি ধরা পড়েছিল। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, বন্ধের নির্দেশ উপেক্ষা করে এসব প্রতিষ্ঠান এখনো অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
মিটফোর্ডের এস আহমেদ মার্কেটের ইস্টার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দেখা যায়, মাত্র দুটি কক্ষ নিয়ে কার্যক্রম চলছে। উপরে ওঠার সিঁড়ি এতটাই সরু যে সুস্থ মানুষেরও চলাচলে অসুবিধা হয়। নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, অপারেশন থিয়েটার কিংবা মানসম্মত পরীক্ষাগার। অথচ বাইরের সাইনবোর্ডে ঝুলছে ছয়জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নাম। অনেক প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক বা নার্সের বদলে রিসিপশন কর্মচারী ও আয়া দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ডা. এ এম শামীম স্বীকার করেছেন যে, এ খাতে জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার সহকারী পরিচালক মাহমুদুর রহমান জানিয়েছেন, বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো ফের চালু হয়েছে কি না সে বিষয়ে তার কাছে তথ্য নেই। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, কেবল অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়; এর জন্য নিয়মিত কঠোর মনিটরিং ও জবাবদিহিমূলক তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।