খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) কর্নারের পরিসংখ্যানে খুলনা অঞ্চলে এইচআইভি সংক্রমণের উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। গত আট মাসে এইডসজনিত জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আরও ৫৫ জনের শরীরে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। মৃতদের মধ্যে ৮ জন পুরুষ, ৭ জন নারী এবং ২ জন শিশু রয়েছে। এই মৃত্যুর ঘটনাগুলো খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, নড়াইল ও পিরোজপুর জেলার রোগীদের ক্ষেত্রে ঘটেছে।
নতুন শনাক্ত হওয়া ৫৫ জন রোগীর মধ্যে ৩৭ জন পুরুষ এবং ১৮ জন নারী রয়েছেন। আক্রান্তদের সামাজিক অবস্থান বিশ্লেষণে দেখা যায়, এদের মধ্যে ২২ জন পুরুষ সমকামী, ৭ জন নারী যৌনকর্মী, ৬ জন পুরুষ যৌনকর্মী, ৮ জন অবৈধভাবে পার্টনার হিসেবে বসবাসকারী এবং একজন ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী নারী রয়েছেন। এছাড়া সাধারণ জনগোষ্ঠীর ১১ জন (৫ জন পুরুষ ও ৬ জন নারী) এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।
এআরটি কর্নারের তথ্য অনুযায়ী, গত আট মাসে পরীক্ষাকৃত ৭৩৫ জনের মধ্যে ৪৩৪ জন ছিলেন পুরুষ এবং ৩০১ জন নারী। মাসভিত্তিক হিসেবে মার্চ মাসে সর্বোচ্চ ৮ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে খুলনা ছাড়াও বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, নড়াইল, পিরোজপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, রাজবাড়ী, মাগুরা, দিনাজপুর ও চট্টগ্রামের বাসিন্দারা রয়েছেন।
এআরটি কর্নারের ডাটা সহকারী চিন্ময় দাস জানান, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত মোট ৭ হাজার ৭৭৩ জনের এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়েছে, যার মধ্যে ৯৬৪ জন রোগী নিবন্ধিত হয়েছেন। নিবন্ধিতদের মধ্যে ৬০৩ জন পুরুষ, ৩৫৩ জন নারী এবং ৮ জন হিজড়া রয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে মোট ১৩৫ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বার্ষিক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে ১ হাজার ৫৪৭ জনের পরীক্ষায় ৮৫ জন আক্রান্ত শনাক্ত হয় এবং ২০ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালে ৬৫ জন শনাক্ত ও ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল, আর ২০২২ সালে ৬৫ জন শনাক্ত ও ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও এআরটি ফোকাল পার্সন ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলী বলেন, সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র পেতে নিয়মিত পরীক্ষার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে যৌনকর্মী, ভাসমান জনগোষ্ঠী এবং অনিরাপদ যৌনসম্পর্কে জড়িতদের নিয়মিত পরীক্ষার আওতায় আনা জরুরি। এছাড়া নিরাপদ যৌন আচরণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে বলে তিনি মত দেন।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ মোশারফ হোসেন এবং খুলনা সিভিল সার্জন ডা. মোছা. মাহফুজা খাতুন জানান, সরকারি ব্যবস্থাপনায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিনামূল্যে পরীক্ষা ও ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থাও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে। তবে সরকার প্রদত্ত এই সেবার পাশাপাশি সংক্রমণ রোধে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ পরিহার ও সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।
নিবন্ধিত রোগীদের মধ্যে সমকামী ২৪০ জন, নারী যৌনকর্মী ১১০ জন, পুরুষ যৌনকর্মী ৬৭ জন, সাধারণ জনগোষ্ঠীর ৪৫০ জন, পার্টনার ৩৭ জন, যৌনকর্মীদের খরিদ্দার ১৫ জন, বিদেশফেরত ২৬ জন, ইনজেকশন ড্রাগ ব্যবহারকারী ২ জন এবং হিজড়া ৮ জন রয়েছেন।