পৃথিবীর নানা প্রান্তে মানুষ উপাসনালয়ে নিজের বিশ্বাসের জায়গা খুঁজে নেয়, কিন্তু ফুটবলের সবুজ মাঠটিও অনেকের কাছে প্রায় ধর্মের মতোই পবিত্র এক স্থান। একটি বল এবং দুটি গোলপোস্টকে কেন্দ্র করে লাখো মানুষের আবেগ ও বিশ্বাস আবর্তিত হয়, যা অন্য কোনো খেলার পক্ষে সম্ভব নয়। অনেক সময় যুক্তির ঊর্ধ্বে গিয়ে মানুষ সৌভাগ্যের তাবিজ বা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলার মতো অন্ধ বিশ্বাসে জড়িয়ে পড়ে, যা কেবল আবেগ দিয়েই ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
ব্রাজিলে ফুটবল জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পেলের দেশ থেকে রোনালদোদের দেশ পর্যন্ত, পাঁচটি বিশ্বকাপ ট্রফি তাদের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। একইভাবে আর্জেন্টিনায় ফুটবল মানেই দিয়াগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসির মতো কিংবদন্তিদের প্রতি গভীর ভালোবাসা। ২০২২ সালে মেসির হাতে বিশ্বকাপ ওঠার পর আর্জেন্টাইনদের কান্না ছিল দীর্ঘ তিন দশকের অপেক্ষার অবসান। অন্যদিকে, মরক্কো দেখিয়েছে ফুটবল দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আফ্রিকা ও আরব বিশ্বের আত্মমর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। ইংল্যান্ডে শত বছরের ক্লাব সংস্কৃতি ফুটবলকে তাদের দৈনন্দিন জীবন ও ইতিহাসের অংশ করে তুলেছে।
বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশগ্রহণ না করলেও, এই সময়ে পুরো দেশের চিত্র বদলে যায়। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কিংবা জার্মানির পতাকা উড়তে থাকে প্রতিটি ছাদে। রাত জেগে খেলা দেখা, চায়ের দোকানে বিশ্লেষণ, কিংবা বাবা-ছেলের কথোপকথনে ফুটবলের গল্প চলে সর্বত্র। একটি গোলের আনন্দ পুরো পাড়াকে জাগিয়ে তোলে। ফুটবল তখন কেবল দূরের কোনো দেশের খেলা থাকে না, বরং মানুষের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
ফুটবলের এই শক্তি ৯০ মিনিটের খেলার চেয়েও বেশি কিছু। এটি ভাষা, ধর্ম ও রাজনীতির বিভেদ ভুলে মানুষকে এক কাতারে নিয়ে আসে। স্টেডিয়ামে একে অপরকে জড়িয়ে ধরার অনুভূতি কোনো ভাষা মানে না। বিশ্বকাপের ৩৯ দিনে কোটি কোটি মানুষ একই গল্পের অংশীদার হয়ে ওঠে। শেষ বাঁশি বাজার পর ট্রফি চলে গেলেও মানুষের বিশ্বাস ফুরায় না। নতুন প্রজন্মের শিশু আবার বল নিয়ে মাঠে নামে, আর চার বছরের নতুন প্রতীক্ষার প্রহর শুরু হয়।