প্রতিটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট এলেই ইংল্যান্ডের ফুটবল সমর্থকেরা একটি সাধারণ স্লোগান দেন, ‘ইট’স কামিং হোম’ বা ফুটবল এবার ঘরে ফিরছে। ১৮৬৩ সালে আধুনিক ফুটবলের নিয়মকানুন প্রণয়নের কারণে ইংল্যান্ডকেই এই খেলার জন্মভূমি হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক ক্লাব লিগটিও এই দেশেই অনুষ্ঠিত হয়। তবে ফুটবল এখন একটি বৈশ্বিক খেলা, যার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সদস্য সংখ্যা জাতিসংঘের সদস্য সংখ্যার চেয়েও বেশি। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন জাগে, ফুটবলের আসল কেন্দ্র বা ঘর আসলে কোথায়?
দীর্ঘদিন ধরে এই প্রশ্নের উত্তর ছিল ব্রাজিল, কারণ দেশটির পুরুষ দল অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশিবার বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব অর্জন করেছে। তবে অতীতের জয়ের হিসাব বর্তমানের মানদণ্ড নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট নয়, যার প্রমাণ চলতি বছরের বিশ্বকাপে শেষ ষোলো থেকে ব্রাজিলের বিদায়। খেলার মান নির্ধারণে ‘এলো স্কোর’ একটি কার্যকর মাধ্যম, যা প্রতিপক্ষের শক্তির ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি ম্যাচের পারফরম্যান্সকে মূল্যায়ন করে। এই র্যাঙ্কিং অনুযায়ী বর্তমানে শীর্ষ দল হলো স্পেন, যারা ১৯ জুলাই ফাইনালে খেলবে।
ফুটবলের বৈশ্বিক কেন্দ্রবিন্দু খোঁজার বিষয়টি কেবল একটি সেরা দলকে চিহ্নিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২৪৪টি পুরুষ জাতীয় দলের অবস্থান ও শক্তির ভারসাম্যের ওপর ভিত্তি করে ফুটবলের একটি ভৌগোলিক কেন্দ্রবিন্দু বা ‘সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি’ বের করা হয়েছে। গত এক শতাব্দীতে ফুটবলের ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তনের সাথে সাথে এই কেন্দ্রবিন্দুটি মানচিত্রে ৩ হাজার মাইলেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়েছে। ১৯০১ সালে এই কেন্দ্রবিন্দুটি ছিল ইংল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলের ঠিক বাইরে, কারণ সে বছর কেবল ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং আয়ারল্যান্ডই আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছিল।
পরবর্তীতে ইউরোপীয়রা যখন পশ্চিমের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে, তখন ফুটবলও সেদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপে আমেরিকার ৯টি দল অংশ নিলেও ইউরোপ থেকে গিয়েছিল মাত্র ৪টি দল। ২০০২ সালে ব্রাজিলের পঞ্চম বিশ্বকাপ জয়ের সময় পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১৭টি বিশ্বকাপের অর্ধেকেরও বেশি জিতেছিল দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলো। তবে এশিয়ার দেশগুলোর ফুটবল খেলা শুরু করা এবং ইউরোপীয় দলগুলোর শক্তি বৃদ্ধির ফলে ফুটবলের এই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু আবারও পূর্ব দিকে ফিরে এসেছে।
২০০২ সালের পর থেকে অনুষ্ঠিত পাঁচটি বিশ্বকাপের চারটিরই চ্যাম্পিয়ন ইউরোপের দেশ এবং চলতি বছরের টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনালের আটটি দলের মধ্যে ছয়টিই ছিল ইউরোপের। বিশ্বের সেরা দলগুলোর শক্তির এই ভারসাম্য এখন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থান করছে, যা স্পেন এবং ফ্রান্সের খুব কাছাকাছি। চলতি আসরে এই দুটি দলই ছিল অন্যতম ফেভারিট। একে অপরের সঙ্গে সেমিফাইনাল খেলে ফ্রান্স বিদায় নেওয়ায় স্পেন এখন শিরোপার অন্যতম দাবিদার। গাণিতিক বিশ্লেষণ বলছে, ফুটবলের বর্তমান ঘরটি এখন বৃটেনের চেয়ে তাদের দক্ষিণ দিকের প্রতিবেশীর অনেক বেশি কাছাকাছি।