ইরানের ওপর চালানো সাম্প্রতিক হামলার নেপথ্যে কেবল হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখার উদ্দেশ্য নেই বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তিনজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে সংস্থাটি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করাই এসব হামলার মূল লক্ষ্য। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক এই হামলাগুলো প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের হাতে আরও কার্যকর সামরিক বিকল্প তুলে দিচ্ছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত বর্তমানে পঞ্চম মাসে গড়িয়েছে এবং গত ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে করা সমঝোতা স্মারক ভেঙে পড়ার পর থেকে উত্তজনা আরও বেড়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ অভিযানে ইরানের সামরিক বাহিনী উল্লেখযোগ্য ক্ষতির সম্মুখীন হলেও, তেহরান এখনো তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধরে রেখেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি এবং ছোট নৌযানসহ বিভিন্ন সামরিক সম্পদ লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা এই হামলাগুলোকে ‘শেপিং অপারেশন’ বা প্রস্তুতিমূলক সামরিক অভিযান হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা ভবিষ্যতে ব্যাপক অভিযানের জন্য মঞ্চ প্রস্তুত করছে। পেন্টাগন অবশ্য এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
এর আগে মার্চ মাসে রয়টার্স জানিয়েছিল, হরমুজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের উপকূলীয় এলাকায় মার্কিন সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের খার্গ দ্বীপে স্থল অভিযানের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেছিল, যে দ্বীপটির মাধ্যমেই দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়। যদিও খার্গ দ্বীপে অভিযানের ঝুঁকি নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে, কারণ মূল ভূখণ্ড থেকে ইরান সহজেই পাল্টা হামলা চালাতে সক্ষম। মঙ্গলবার ফক্স নিউজের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, তিনি সামরিক বাহিনীকে ইরানের তেল স্থাপনায় হামলা এড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন, তবে দ্বীপটি দখলের সম্ভাবনা তিনি নাকচ করেননি। এছাড়া তিনি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এ হামলার হুমকিও দিয়েছেন।
সিএসআইএস-এর সামরিক বিশ্লেষক মার্ক ক্যানসিয়ান মনে করেন, খার্গ দ্বীপ দখলের মতো বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা একদিকে যেমন কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, অন্যদিকে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক কৌশল সম্পর্কে আগাম ধারণা দিয়ে দিচ্ছে। সমালোচকদের মতে, এই অভিযানগুলো ইরানের প্রচলিত সামরিক বাহিনীর ক্ষতি করলেও তেহরানকে রাজনৈতিক বা কূটনৈতিকভাবে কোনো ছাড় দিতে বাধ্য করতে পারেনি। এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব এখনো বিদ্যমান, যা বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেল সরবরাহের ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে বলে জানা গেছে, যেখানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামরিক অভিযান আরও জোরদারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তবে আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষক ইমরান বায়ুমির মতে, ট্রাম্পের কঠোর বক্তব্য মূলত তেহরানকে চাপে রাখা এবং অনিশ্চয়তায় ফেলার একটি কৌশল মাত্র।