রাজধানীসহ দেশের সরকারি ও বেসরকারি অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মান নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত ও কার্যকরভাবে পাঠদান করেন না। সিলেবাস শেষ করার অজুহাতে দায়সারা ক্লাস নেওয়া কিংবা নানা অযুহাতে অনুপস্থিত থাকার প্রবণতা বাড়ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা পাঠ যথাযথভাবে আয়ত্ত করতে পারছে না। উল্টো অনেক শিক্ষককে কোচিং ও প্রাইভেট পড়াতে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়, যেখানে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত বা বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে।

শ্রেণিকক্ষের এই ঘাটতি পূরণে বাধ্য হয়ে অভিভাবকরা কোচিং, প্রাইভেট বা গৃহশিক্ষকের ওপর নির্ভর করছেন। এতে একদিকে অভিভাবকদের আর্থিক ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় পড়াশোনার চাপে শিক্ষার্থীরা শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। এছাড়া নিষিদ্ধ নোট ও গাইড বইয়ের ব্যবহার এখনো বন্ধ হয়নি। কোচিংবাণিজ্যের দৌরাত্ম্য বন্ধে ২০১১ সালে হাইকোর্টে একটি রিট করেন অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু। ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিংবাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা’ করা হলেও দীর্ঘ এক যুগেও তার কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) অনলাইনে ক্লাস মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মাঠপর্যায়ে সরাসরি তদারকি ছাড়া শুধু অনলাইন মনিটরিং কাঙ্ক্ষিত সুফল দেবে না। বিশেষজ্ঞরা শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত শিক্ষার অভাব, শিক্ষক সংকট, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর দূরত্ব, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং অপর্যাপ্ত বাজেটকে শিক্ষার মান হ্রাসের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পরিকল্পনা কমিশনের ২০২১ সালের জরিপ অনুযায়ী, সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় শিক্ষা সেবা থেকে বঞ্চিত।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষকদের বেতনের বিনিময়ে অর্পিত দায়িত্ব পালনে কোনো ঘাটতি থাকা উচিত নয়। অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত খোঁজখবর রাখা জরুরি। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অভিভাবকরা অভিযোগ করেছেন যে, ক্লাসের চেয়ে শিক্ষকদের প্রাইভেটে আগ্রহ বেশি। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু ২০১২ সালের কোচিংবাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম জানান, করোনাপরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমেছে এবং অনেক অভিভাবক বাড়িতে সন্তানদের গাইডলাইন দিতে পারছেন না। তবে শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যের কারণে ক্লাসে অনুপস্থিতির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন।

মাউশি গত ১০ জুলাই সেন্ট্রাল অনলাইন মনিটরিং সিস্টেম চালুর নির্দেশ দিয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের ১৩ জুলাইয়ের মধ্যে গুগল ফর্মে প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানান, বর্তমান সরকার শিক্ষার মান উন্নয়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। ইতিমধ্যে শিক্ষায় জিডিপির দুই শতাংশ বরাদ্দ, কারিকুলাম পরিমার্জন এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও সম্মানী বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন এবং স্বৈরাচারী সরকারের আমলে কেবল অবকাঠামো উন্নয়নের নামে হিউম্যান রিসোর্সের অবহেলার সমালোচনা করেছেন।