বর্তমান সময়ে শহর কিংবা প্রবাসে বসবাসরত বাঙালি পরিবারগুলোর কাছে সন্তানদের কোরআন শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে অনলাইন মাদরাসা। স্কাইপ, জুম বা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ঘরে বসেই দক্ষ শিক্ষকের কাছ থেকে কোরআন শেখার এই সুযোগ সাশ্রয়ী ও সময়সাশ্রয়ী হলেও এর আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে সাইবার গ্রুমিং বা নিপীড়নের মতো ভয়াবহ ঝুঁকি। সন্তান মহান আল্লাহর দেওয়া আমানত এবং তাকে সব ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা করা অভিভাবকদের দায়িত্ব। সহিহ বুখারির ৭১৩৮ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, প্রতিটি অভিভাবক নিজের অধীনস্থদের বিষয়ে জবাবদিহি করবেন এবং সুরা তাহরিমের ৬ নম্বর আয়াত অনুযায়ী পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষার নির্দেশ রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে অভিভাবকের জন্য কিছু কঠোর সুরক্ষানীতি বাস্তবায়ন করা জরুরি। সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অনলাইন ক্লাসকে নিরাপদ রাখতে কয়েকটি নিয়ম বাধ্যতামূলক করা উচিত: ১. শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে ব্যক্তিগত যোগাযোগের সুযোগ বন্ধ রাখতে হবে। হোয়াটসঅ্যাপ, ইমেইল বা সোশ্যাল মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ অভিভাবকের হাতে থাকতে হবে এবং শিক্ষক যেন সরাসরি শিশুর সাথে চ্যাট না করেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকের সাথে পেশাদার সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। ৩. ক্লাসের ফাঁকে বা আড্ডার ছলে শিশু যেন তার স্কুলের নাম, বাসার ঠিকানা, পরিবারের সদস্যদের কর্মস্থল, কিংবা সাপ্তাহিক যাতায়াতের রুটিনের মতো সংবেদনশীল তথ্য শেয়ার না করে, সে বিষয়ে তাকে সতর্ক করতে হবে। সাইবার অপরাধীরা এসব তথ্য ব্যবহার করে পরবর্তী সময়ে ব্ল্যাকমেইল বা সশরীরে শিশুর ক্ষতি করার পরিকল্পনা করে।

চতুর্থত, অনলাইন ক্লাস কখনোই বন্ধ ঘরে একা নেওয়া যাবে না। ৪. ইসলামে ‘খালওয়াহ’ বা কোনো পরপুরুষের সঙ্গে নারীর নির্জনে অবস্থানকে যেভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, ডিজিটাল মাধ্যমে ক্যামেরার ওপারে একা থাকাও এক ধরনের ‘ডিজিটাল নির্জনতা’ তৈরি করতে পারে। রাসুল (সা.) বলেছেন, “কোনো পুরুষ যখনই কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে একাকী হয়, তখন তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।” (সুনানে তিরমিজি: ২১৬৫)। ড্রয়িংরুম বা ডাইনিংয়ের মতো উন্মুক্ত স্থানে ক্লাস করতে হবে যাতে পরিবারের অন্য সদস্যরা তা শুনতে বা দেখতে পান। কোনো শিক্ষক যদি শিশুকে একা ক্লাস করানোর দাবি করেন, তবে তা একটি বড় সতর্কবার্তা বা ‘রেড ফ্ল্যাগ’ হিসেবে গণ্য করে শিক্ষক পরিবর্তন করা উচিত।

পঞ্চমত, শিশুকে শারীরিক সীমানা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। তাকে স্পষ্ট জানাতে হবে যে স্ক্রিনে কেবল মুখমণ্ডল ও হাত দৃশ্যমান থাকবে এবং এর বাইরে কোনো অঙ্গ দেখানোর অনুরোধ এলে সে যেন তৎক্ষণাৎ কল কেটে দেয়। ক্লাস শুরুর আগেই অভিভাবকদের উচিত এসব শর্ত শিক্ষককে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া। মনে রাখতে হবে, ছদ্মবেশী অপরাধীর হাত থেকে সন্তানকে রক্ষা করা তাজবীদের ভুলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অবহেলায় শিশুর মনে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্ষত বা ধর্মের প্রতি অনীহা তৈরি হতে পারে।