সিন্ডিকেট বা মজুতদারি বলতে বোঝায় মূল্যবৃদ্ধির আশায় খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করে রাখা। আরবিতে একে ‘আল-ইহতিকার’ বলা হয়। প্রথম আরবি অভিধান রচয়িতা খলিল ইবনে আহমদ আল-ফারাহিদি (রহ.)-এর মতে, খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যজাত অন্যান্য জিনিস মজুত করাকে ইহতিকার বলে, যার অর্থ জমা করা। যিনি মূল্যবৃদ্ধির অপেক্ষায় খাদ্যদ্রব্য জমা করে রাখেন, তাকে মজুতদার বলা হয়। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, নিজের প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এবং জনগণের তীব্র প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও মূল্যবৃদ্ধির আশায় খাদ্যদ্রব্য বিক্রি না করাকেই সিন্ডিকেট বা মজুতদারি বলে। ইমাম আওজায়ি (রহ.)-এর মতে, যে ব্যক্তি পণ্য বাজারজাতকরণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, সেই মজুতদার।

বর্তমানে দেশে সিন্ডিকেটের কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। সরকার প্রতিটি পণ্যের একটি নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও, কিছু অসাধু চক্র সেই সুযোগ নিয়ে পণ্য রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আকাশচুম্বী দামে তা বিক্রি করা হয়। এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়, ফলে তারা না পারে বেশি দামে কিনতে, না পারে সঞ্চয় করে রাখতে।

ইসলামে অতি মুনাফার উদ্দেশ্যে খাদ্যসামগ্রী মজুত করা সম্পূর্ণ হারাম (৬/৪৫)। এটি খাদ্যদ্রব্যের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। মজুতদারদের হাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী জমা থাকায় তারা নিজেদের ইচ্ছামতো মূল্য নির্ধারণ করে, যা অমানবিক ও নৈতিকতাবিবর্জিত। এ কারণে ইসলাম সিন্ডিকেটকে নাজায়েজ ও হারাম ঘোষণা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শুধু পাপী ব্যক্তিই মজুতদারি বা সিন্ডিকেট করে থাকে।’ (মুসলিম : ১৬০৫)। ফিকহের কিতাব অনুযায়ী, বাজারমূল্য কম থাকা অবস্থায় খাদ্যদ্রব্য কিনে গুদামজাত করা এবং অত্যধিক প্রয়োজনের সময় উচ্চমূল্যে বিক্রি করা সকল ইসলামি আইনজ্ঞের মতে হারাম। এই ধরনের কর্মকাণ্ডে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এটি ইসলামি আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ।

ইসলাম সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের জন্য খাদ্যসামগ্রীর অবাধ প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে অবৈধ মজুত নিষিদ্ধ করেছে। মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী, খাদ্যসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, খাদ্যশস্য ইত্যাদি চড়াদামে বিক্রির উদ্দেশ্যে মজুত করা হারাম। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-এর মতে, যেসব ক্ষেত্রে মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভর করে, সেসব ক্ষেত্রে কোনো প্রকার বাধা সৃষ্টি করা হারাম।

তবে সকল মজুতদারি হারাম নয়। কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মজুতদারি হারাম বলে বিবেচিত হয়। যেমন: স্বল্পমূল্যে খাদ্যদ্রব্য কিনে বেশি লাভের আশায় এমনভাবে গুদামজাত করা যার ফলে বাজারে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় (১); এমন পরিমাণে পণ্য গুদামজাত করা যার কারণে বাজারে চরম সংকট সৃষ্টি হয় (২); মানুষের খাদ্য সংকটের সময় যেকোনো পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করা (৩); এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির জন্য গুদামজাত করা (৪)। এই ধরনের কাজ নিষিদ্ধ ও গোনাহের। শুধু ব্যবসায় নয়, গাড়ি, লঞ্চ বা ট্রেনের টিকিটের ক্ষেত্রেও সিন্ডিকেট দেখা যায়, যেখানে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের জন্য টিকিট মজুত করা হয় (৫)। এই সিন্ডিকেটগুলোর মাধ্যমে মূলত ব্যবসায়ী ও মালিকপক্ষ লাভবান হয়, আর সাধারণ জনগণ আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসলাম এই ধরনের বৈষম্য ও জুলুমকে হারাম ঘোষণা করেছে, কারণ এতে গরিব, দুঃখী ও অসহায় মানুষ কষ্টে পড়ে।

অবৈধ খাদ্য মজুতকারীদের জন্য ইসলামে ভয়াবহ শাস্তির বিধান রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমদানিকারক রিজিকপ্রাপ্ত আর মজুতদাররা লানতপ্রাপ্ত, অভিশপ্ত।’ (মুসনাদে দারেমি : ২৫৮৬)। তিনি আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যদ্রব্য মজুত করে, আল্লাহ তাকে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত করবেন অথবা দেউলিয়া বানাবেন।’ (আল-মুন্তাখাবুল আদাবি : ১৭)। মজুতদারদের রাসুলুল্লাহ (সা.) পাপিষ্ঠ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘পাপিষ্ঠ ছাড়া কেউ মজুতদার হতে পারে না।’ (মুসলিম : ১২২৮)। এই ধরনের মজুতদারি ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ (৫৮)।

সিন্ডিকেট ইংরেজি শব্দ। অর্থ- গুদামজাত করা, মজুত করে রাখা। সিন্ডিকেটের আরবি প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘আল-ইহতিকার’। প্রথম আরবি অভিধান রচয়িতা খলিল ইবনে আহমদ আল-ফারাহিদি (রহ.) বলেন, ‘খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যজাত অন্যান্য জিনিস মজুত করাকে ইহতিকার বলে। এর অর্থ- জমা করা। সুতরাং যে ব্যক্তি মূল্যবৃদ্ধির অপেক্ষায় খাদ্যদ্রব্য জমা করে রাখে, তাকে মজুতদার বলে।’ (আল-আইন : ৩/৬২)। সিন্ডিকেট বা মজুদদারির পারিভাষিক অর্থ প্রসঙ্গে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, ‘নিজের প্রয়োজন মুক্ত থাকা ও জনগণের প্রয়োজন সত্ত্বেও মূল্যবৃদ্ধির অপেক্ষায় খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করা থেকে বিরত থাকাকে সিন্ডিকেট বা মজুতদারি বলে।’ (ফাতহুল বারি ফি শরহিল বুখারি : ৪/৪৪০)। ইমাম আওজায়ি (রহ.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি পণ্য বাজারজাত করার পথে প্রতিবন্ধক হয়, সে-ই মজুতদার। অর্থাৎ বাজারে বাজারে ঘুরে মানুষের প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য মজুতকরণের উদ্দেশ্যে ক্রয় করার কাজে যে নিজেকে নিয়োজিত করে, তাকে মজুতদার বলে।’ (নাইলুল আওতার : ৩/৬০৫)।

যেসব পণ্য মজুত করা হারাম : সমাজের বণিক, ধনী, দুস্থ, অসহায় সব শ্রেণির মানুষের খাদ্যসামগ্রীর অবাধ প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে ইসলাম খাদ্যের অবৈধ মজুত নিষিদ্ধ করেছে। মানুষের দৈনন্দিনের প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী, খাদ্যসংশ্লিষ্ট গুরুত্বগূর্ণ উপাদান, উপকরণ, খাদ্যশস্য ইত্যাদি চড়াদামে বিক্রির ইচ্ছায় মজুত করা হারাম। (আল-জামে লি উলুমি ইমাম আহমদ : ৯/১৫৯)। ইমাম আবু দাউদ (রহ.) বলেন, ‘আমি ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোন জিনিস গুদামজাত করা নিষেধ?’ তিনি বললেন, ‘মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস। অর্থাৎ যেসব ক্ষেত্রে মানুষের জীবন ও জীবিকা (খাদ্য) রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে কোনো প্রকার বাধা সৃষ্টি করা হারাম।’