রাজধানীর হোটেল শেরাটনের গ্র্যান্ড বলরুমের জমকালো আয়োজনে সম্পন্ন হলো লার্নিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (L&D) ও প্রশিক্ষণ খাতের শীর্ষস্থানীয় সংগঠন ট্রেইনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (TAB) আয়োজিত দিনব্যাপী ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রেইনার্স কনফারেন্স ২০২৬’। ‘Skills Matter’ বা ‘দক্ষতাই আসল’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেশ-বিদেশের শিক্ষাবিদ, কর্পোরেট লিডার, এইচআর প্রফেশনাল এবং পাঁচ শতাধিক প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ অংশ নেন।
সম্মেলনের মূল আকর্ষণ ছিল মালয়েশিয়ার সফল মডেলের আদলে তৈরি ‘HRD কর্পোরেশন বাংলাদেশ’ নামক একটি রূপান্তরমূলক কৌশলগত মডেলের যৌথ উপস্থাপন। ট্রেইনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ডক্টর মো. ইউসুফ ইফতি এবং সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য (ভিসি) প্রফেসর ডক্টর ইউসুফ মাহবুবুল ইসলাম এই কি-নোট প্রেজেন্টেশনটি পেশ করেন। যৌথ এই কি-নোট প্রেজেন্টেশনে তারা দেখান কীভাবে এই মডেলের মাধ্যমে বেসরকারি খাতের (Private Sector) কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব এবং কীভাবে এটি দেশের বিদ্যমান স্কিলস গ্যাপ দূর করতে কাজ করবে। উপস্থাপনায় দেখানো হয়, এই মডেলটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের জিডিপিতে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার অবদান রাখা সম্ভব। এছাড়া এর অধীনে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফাইড ট্রেইনার তৈরি এবং দেশব্যাপী প্রশিক্ষকদের একটি ডাটাবেজ তৈরির সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে ট্রেইনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও শিক্ষাবিদ ডক্টর কে এম হাসান রিপন বর্তমান কর্পোরেট খাতের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, আজকের প্রতিযোগিতাপূর্ণ কর্পোরেট দুনিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির চেয়ে বাস্তবমুখী দক্ষতা বা ‘স্কিলস’ অনেক বেশি জরুরি। শিল্পখাতে দক্ষতার ঘাটতি বা স্কিলস গ্যাপ দূর করতে না পারলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। এই গ্যাপ পূরণে তিনি সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক কিছু সলিউশন তুলে ধরেন, যা বাংলাদেশের সামগ্রিক দক্ষতা বৃদ্ধি ও দক্ষ জনশক্তি গড়তে এক অনন্য ফ্রেমওয়ার্ক হিসেবে কাজ করবে বলে উপস্থিত সকলে একমত পোষণ করেন। এই আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল আজকের অনুষ্ঠানের মূল কি-নোট প্রেজেন্টেশন (Keynote Presentation)।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যতম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনএসডিএ (NSDA)-এর এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান (সচিব) ডক্টর নাসরীন আফরোজ চৌধুরী। এই প্রস্তাবনাকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও চমৎকার আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের হিউম্যান ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্টে এই প্রস্তাবটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এনএসডিএ এটি নিয়ে ইতিবাচকভাবে কাজ করবে এবং দেশে বাস্তবায়নের ব্যাপারে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেবে।
সম্মেলনের আরেক প্রধান অতিথি ও প্রধান বক্তা শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এমপি দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে এক সুতোয় বাঁধার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রাথমিক পর্যায় থেকেই দক্ষ ও মানবিক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের লিডারশিপ, এমপ্যাথি (সহমর্মিতা), কমিউনিকেশন এবং টিম-বিল্ডিংয়ের মতো সফট স্কিলসের উন্নয়নে ট্রেইনার্স অ্যাসোসিয়েশনের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ মডিউলটি দেশব্যাপী কার্যকর করার জন্য তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা জমা দেওয়ার আহ্বান জানান।
প্রশিক্ষকদের পেশাগত মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সম্মেলনে ৫টি বিশেষায়িত ‘ফিচার্ড সেশন’ অনুষ্ঠিত হয়। সেশনগুলোতে জিসান কিংশুক হক, আয়মান সাদিক, কাজী এম আহমেদ, ইজাজুর রহমান, অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত ট্রেইনার ডেক্সটার ডেহিং এবং সিঙ্গাপুরের মিস সুচিসহ দেশি-বিদেশি খ্যাতিসম্পন্ন প্রশিক্ষকেরা সেশন পরিচালনা করেন।
দেশের লার্নিং, ডেভেলপমেন্ট ও সাংগঠনিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অনুষ্ঠানে ৫টি ক্যাটাগরিতে বিশেষ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়:
- লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড: কাজী এম আহমেদ (প্রতিষ্ঠাতা, বোল্ড এবং সিইও, কাজী কনসালটেন্টস)
- ডিস্টিংগুইশড কন্ট্রিবিউশন টু ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড: নিলুফার আহমেদ করিম (বিশিষ্ট প্রশিক্ষক ও জেন্ডার বিশেষজ্ঞ)
- লার্নিং লিডারশিপ এক্সেলেন্স অ্যাওয়ার্ড: মাইক কাজী (সফল উদ্যোক্তা, ইও বাংলাদেশ-এর প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও কাজী রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী)
- লার্নিং অর্গানাইজেশন এক্সেলেন্স অ্যাওয়ার্ড: বিকাশ একাডেমি (b.Academy – bKash)
- আউটস্ট্যান্ডিং মেম্বার অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড: شاہীনা আশরাফ (TAB-এর নিবেদিতপ্রাণ সদস্য)
বিশেষ অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন ড্যাফোডিল গ্রুপের চেয়ারম্যান ডক্টর সবুর খান এবং এফবিএইচআরআরও এর প্রেসিডেন্ট ড. মোশাররফ হোসেন। প্যানেল ডিসকাশনে অংশ নেন ট্রেইনার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোরাদ হোসেন, ডিরেক্টর ইনোভেশন জিয়াউদ্দিন মাহমুদসহ দেশের দুটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এবং শীর্ষ এইচআর প্রফেশনালরা।
সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে ট্রেইনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জেনারেল সেক্রেটারি মিস লায়লা নাজমীন আগত অতিথি, স্পিকার ও স্পন্সরদের ধন্যবাদ জানান। তিনি ঘোষণা দেন যে, আগামী বছরের ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রেইনার্স কনফারেন্স ২০২৭’ আরও দুর্দান্ত কোনো ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হবে। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দক্ষতা উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি সব ধরনের স্টেকহোল্ডার, এমপ্লয়ার ও কর্পোরেট সেক্টরের সাথে যৌথভাবে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
আমি ট্রেইনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-কে আহ্বান জানাচ্ছি আপনারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা (Proposal) জমা দিন।