একসময় নদী, শিক্ষা ও সংস্কৃতির নগরী হিসেবে পরিচিত বরিশালের বর্তমান বাস্তবতায় মাদকের ভয়াল থাবা এক বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগরীর অলিগলি থেকে শুরু করে জনবহুল বিভিন্ন এলাকায় মাদকের নেটওয়ার্ক দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তরুণ সমাজ। কিশোর থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থীই ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য ভয়ংকর মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছেন। এই পরিস্থিতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ, পারিবারিক ভাঙন, মানসিক অবসাদ এবং সামগ্রিক সামাজিক অস্থিরতা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নগরীর অন্তত অর্ধশত এলাকায় নিয়মিত মাদক কেনাবেচা ও সেবন চলছে। এর মধ্যে কাউনিয়া, ভাটিখানা, ত্রিশ গোডাউন, বেলস পার্কের হেলিপ্যাড, কেডিসি, মুক্তিযোদ্ধা পার্ক, রসুলপুর, পলাশপুর, বেলতলা, লামছড়ি, রূপাতলী, সাগরদী, বাংলাবাজার, ভাটারখাল, স্টেডিয়াম কলোনি, ওয়াপদা কলোনি, কাশিপুর বাজার, চর কাউয়া এবং কর্ণকাঠি চৌমাথার মতো এলাকাগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাসিন্দাদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালিত হলেও মাদক কারবারিরা কিছুদিন আত্মগোপনে থেকে পুনরায় একই কার্যক্রম শুরু করে, যা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ সৃষ্টি করছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মাদকবিরোধী অভিযান চলমান থাকলেও পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। বরিশাল মহানগর পুলিশের (বিএমপি) তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত এক বছরে মহানগরের চারটি থানায় ৪৮৭টি মাদক মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী জেলায় ১ হাজার ৯০৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ১ হাজার ৭৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া সাতটি সরকারি ও বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে ৬৪১ জন রোগী চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, মামলার সংখ্যা এবং চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি মাদকের বিস্তারের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোর তথ্যানুযায়ী, চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বড় একটি অংশ তরুণ। দ্য নিউ লাইফ মাদকাসক্তি ও মানসিক রোগ নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক মর্তুজা জুয়েল জানান, বর্তমানে তাদের কেন্দ্রে প্রায় ১০০ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যাদের ৯০ শতাংশই তরুণ এবং প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চারজন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। তিনি বলেন, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক অবসাদ বা বন্ধুর প্রভাবে অনেকে মাদকের দিকে ঝুঁকছেন এবং তারা কাউন্সেলিং ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। সেভ দ্য লাইফ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক সাখাওয়াত হোসেন মিঠু জানান, তাদের রোগীদের অধিকাংশই ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী এবং পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশের নেতিবাচক প্রভাব আসক্তির মূল কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকাসক্তিকে কেবল অপরাধ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ডা. মিজানুর রহমান এটিকে মানসিক, সামাজিক ও জনস্বাস্থ্যগত সংকট হিসেবে আখ্যায়িত করে শাস্তির পাশাপাশি মানবিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. তপন কুমার সাহা বলেন, একাকিত্ব, হতাশা ও সঙ্গদোষের মতো বিষয়গুলো তরুণদের মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। তাই আসক্তির পাশাপাশি মাদকের পেছনের কারণগুলো সমাধান করতে পরিবার ও সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক তানভীর হোসেন খান জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত অভিযান চলছে এবং আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সচেতনতা কার্যক্রম চালাতে হবে। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আশিক সাঈদ বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স এবং নগরীকে মাদকমুক্ত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে বরিশালে মাদকের বিস্তার রোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদী মানবিক উদ্যোগের দাবি উঠেছে।