বাংলাদেশ বর্তমানে নানাভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে স্মরণ করছে। ফেসবুক পোস্ট, টক শো, গ্রাফিতি, জনসমাবেশ, প্রামাণ্যচিত্র এবং জুলাইয়ের অর্থ ও নেতৃত্ব নিয়ে চলমান রাজনৈতিক দাবি-দাওয়ার মাধ্যমে সেই স্মৃতি বারবার ফিরে আসছে। তবে এই স্মরণের বহুমাত্রিক পরিবেশের ভিড়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনো বিপজ্জনকভাবে উপেক্ষিত রয়ে গেছে—জুলাইকে সম্ভব করে তোলা সাধারণ মানুষের জীবন্ত স্মৃতি সংরক্ষণ। এই অভ্যুত্থান কেবল অভিজাত রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনা বা দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন ছিল না; এটি ছিল এক গভীর নাগরিক জাগরণ, যেখানে ছাত্র, শ্রমিক, তরুণ, সাধারণ নাগরিক, পরিবার ও স্থানীয় সম্প্রদায় গ্রেপ্তার, গুলি এবং মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও রাজপথে নেমে এসেছিল।

এই অভ্যুত্থানের গভীরতম ইতিহাস কেবল এর চূড়ান্ত ফলাফলে নেই। এর আসল ইতিহাস লুকিয়ে আছে যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, রামপুরা-বাড্ডা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, জেলা শহর, গলি, হাসপাতাল, ঘরবাড়ি ও ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের স্মৃতিতে। আছে সেসব মানুষের অভিজ্ঞতায়, যারা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে সহিংস ও তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তগুলোর সাক্ষী। এই স্মৃতিগুলো এখনই লিপিবদ্ধ না করলে জুলাইয়ের একটি বড় অংশ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার চেয়েও বড় বিপদ হলো, পুরোনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা তখন জুলাইয়ের ইতিহাসকে বিকৃত, দুর্বল বা মুছে ফেলার সুযোগ পাবে।

এ কারণেই বাংলাদেশের প্রয়োজন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি জাতীয় মৌখিক ইতিহাস আর্কাইভ। সরকার, বিশেষত সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় অথবা একটি নিবেদিত জাতীয় কমিশনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়, আর্কাইভবিদ, ইতিহাসবিদ, নাগরিক সমাজ, বেঁচে ফেরা অংশগ্রহণকারীদের নেটওয়ার্ক, শহীদ পরিবার, সাংবাদিক এবং বিদ্যমান জুলাই-ডকুমেন্টেশন উদ্যোগগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে একটি পেশাদার সাক্ষ্য সংগ্রহ প্রকল্প হাতে নেওয়া জরুরি। এর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সরল কিন্তু ঐতিহাসিক: স্মৃতি ম্লান হওয়ার আগে, বয়ানগুলো কঠিন রাজনৈতিক রূপ নেওয়ার আগে এবং রাজনৈতিক স্বার্থ জাতিকে কী মনে রাখতে দেওয়া হবে তা নির্ধারণ করার আগে, জুলাইয়ের মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা রেকর্ড, সংরক্ষণ এবং নাগরিক ও গবেষণা-পরিসরের জন্য সহজলভ্য করে তোলা।

এই কাজের জরুরিতা স্পষ্ট। জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়ের এক প্রতিবেদনে দমন-পীড়নের সময় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন বলে অনুমান করা হয়েছে। যদিও সরকারি হিসেবে এখনো মৃত্যুর সংখ্যা মাত্র ৮ শতাধিক। বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মৃত্যুর রেজিস্ট্রি খাতা গায়েব করে ফেলেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। সংখ্যার এই তারতম্যের অবসানে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ অপরিহার্য। তবে কেবল সংখ্যা দিয়ে জুলাইকে বোঝা যায় না। মৃত্যুর সংখ্যা আমাদের ক্ষতির পরিমাণ জানাতে পারে, কিন্তু সাহসের মানবিক গভীরতা জানাতে পারে না। একজন তরুণ ছাত্র কেন বাড়ি থেকে বের হয়েছিল, একজন রিকশাচালক কীভাবে আহত প্রতিবাদকারীদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে সাহায্য করেছিলেন, কীভাবে মহল্লায় মানুষ অনানুষ্ঠানিক সতর্কবার্তা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল, অথবা কীভাবে প্রতিবাদকারীরা বারবার আক্রমণের মুখেও টিকে থাকার কৌশল শিখেছিল—এই গল্পগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিটি এলাকায় জুলাই ভিন্নভাবে ঘটেছে। যাত্রাবাড়ী কেবল মানচিত্রের একটি স্থান ছিল না, এটি নাগরিক প্রতিরোধের এক প্রতীকে বা অভ্যুত্থানের একধরনের ‘স্টালিনগ্রাদ’-এ পরিণত হয়েছিল। উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, রামপুরা-বাড্ডা এবং দেশের অন্যান্য সংঘর্ষপ্রবণ অঞ্চলের প্রতিটিরই ছিল নিজস্ব ছন্দ: মুখোমুখি হওয়া, পিছু হটা, পুনর্গঠন, আত্মত্যাগ এবং বেঁচে থাকার আলাদা ইতিহাস। ওপর থেকে লেখা ইতিহাস সবসময় লেখকের প্রাপ্তি, অগ্রাধিকার ও বর্জনের সীমাবদ্ধতা বহন করে। আমাদের প্রয়োজন অভ্যুত্থানের একটি জনভিত্তিক ভূগোল, যা গড়ে উঠবে তাদের কণ্ঠে, যারা সেখানে উপস্থিত ছিল।

এ ধরনের আর্কাইভের পদ্ধতি হতে পারে সহজ। প্রশিক্ষিত সাক্ষাৎকার গ্রহীতারা অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে বসবেন এবং তাদের অভিজ্ঞতা শুরু থেকে বর্ণনা করতে দেবেন। লক্ষ্য হবে তারা কেন যুক্ত হলেন, কী দেখলেন, স্থানীয়ভাবে দমন-পীড়ন কীভাবে ঘটল, প্রতিবাদকারীরা কীভাবে বেঁচে থাকলেন ও একে অন্যকে সাহায্য করলেন এবং কোন স্মৃতিগুলো তাদের কাছে এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা সংরক্ষণ করা। উদ্দেশ্য কোনো রাজনৈতিক স্ক্রিপ্ট চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং জুলাই যে মানবিক গভীরতায় বেঁচে ছিল, সেই অভিজ্ঞতাকে সংরক্ষণ করা। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সরকারি ইতিহাস অনেক সময় ঘটনাকে নেতা, প্রতিষ্ঠান, তারিখ, ঘোষণা এবং ফলের মাধ্যমে মনে রাখে। কিন্তু জনতার ইতিহাস মনে রাখে তার নিচের নৈতিক ও মানবিক অভিজ্ঞতাকে।

একটি মৌখিক ইতিহাস আর্কাইভ জুলাইকে বিকৃতির হাত থেকেও রক্ষা করবে। ইতিহাসের প্রতিটি বড় মোড়ের পর রাস্তা নীরব হয়ে গেলে আরেকটি সংগ্রাম শুরু হয়: স্মৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণের সংগ্রাম। কেউ কেউ জুলাইকে একচেটিয়া করতে চাইবে, কেউ এটিকে দলীয় সম্পদে পরিণত করতে চাইবে, আবার কেউ সেই নৃশংসতাকে আড়াল করতে চাইবে যা অভ্যুত্থানকে অনিবার্য করেছিল। হাজার হাজার সাক্ষ্য যদি রেকর্ড, তালিকাভুক্ত ও সংরক্ষিত থাকে, তাহলে কোনো একক রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পক্ষে পুরো ইতিহাসের মালিকানা দাবি করা সহজ হবে না।

স্মৃতি শুধু অতীতের বিষয় নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি গণতান্ত্রিক সম্পদ। যে সমাজ স্বাধীনতার মূল্য মনে রাখে, তাকে প্রতীকী ইঙ্গিত দিয়ে সহজে শান্ত করা যায় না। জুলাইয়ের নৈতিক শক্তি এসেছে একটি বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষা থেকে: এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে ক্ষমতা জবাবদিহির অধীন, নাগরিকের মর্যাদা আছে, বাকস্বাধীনতা আছে, প্রতিষ্ঠানগুলো দখলদারিত্বমুক্ত, অর্থনৈতিক সুযোগ কিছু মানুষের হাতে বন্দি নয় এবং রাষ্ট্র তার নিজস্ব জনগণকে প্রজা হিসেবে বিবেচনা করে না। অভ্যুত্থানের স্মৃতি যদি ম্লান হয়ে যায়, অর্থবহ সংস্কারের জন্য জনচাপও ম্লান হয়ে যাবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দেশের সামনে একটি বিরল সুযোগ এসেছে: আনুষ্ঠানিক স্মরণচর্চার বাইরে গিয়ে সংরক্ষণের গুরুতর কাজ শুরু করা। বক্তৃতা, দেয়ালচিত্র, দোয়া, প্রদর্শনী ও জনসম্মান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সবচেয়ে অর্থবহ শ্রদ্ধা হবে একটি জাতীয় মৌখিক ইতিহাস উদ্যোগ শুরু করা, যা তাদের স্মৃতি ধারণ করবে, যারা নিজেদের শরীরে, নিজেদের মহল্লায় এবং নিজেদের শোকে জুলাইকে বহন করেছেন। স্মৃতি মিথে পরিণত হওয়ার আগে, বাংলাদেশকে জুলাইয়ের একটি জনতার আর্কাইভ গড়ে তুলতেই হবে।