সাতক্ষীরার ৬৮ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী সাইদ উদ্দীন (ছদ্মনাম) স্মার্টফোন ব্যবহার করেন, কিন্তু এর মাধ্যমে অনলাইন ব্যাংকিং, সরকারি সেবা বা কৃষিতথ্য পাওয়ার সুযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তাঁর মতো মানুষের বড় একটি অংশ এখনো ডিজিটাল প্রযুক্তির পূর্ণ সুবিধা নিতে পারছেন না। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) ২০২৪ সালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত সর্বশেষ ডিজিটাল অগ্রগতি সূচকে এমন চিত্রই ফুটে উঠেছে। সূচক অনুযায়ী, ডিজিটাল দৌড়ে বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।

আইটিইউর এবারের বিশ্লেষণে ১৫৯টি দেশের আইসিটি পরিষেবার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশের স্কোর ৬৮ দশমিক ৯, যা গত বছরের ৬৪ দশমিক ৯ স্কোরের তুলনায় ৬ শতাংশ বেশি। এটি গত কয়েক বছরের মধ্যে বড় লাফ হলেও ভিয়েতনাম (৮৮ দশমিক ৪), ভুটান (৮৬ দশমিক ৪), কম্বোডিয়া (৭৮ দশমিক ৭), শ্রীলঙ্কা (৭৩ দশমিক ২) এবং মিয়ানমারের (৭১ দশমিক ৬) চেয়ে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। তালিকার নিচের দিকে থাকা পাকিস্তানের স্কোর ৬৭ দশমিক ৭ এবং আফগানিস্তানের ৩৬ দশমিক ২।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির মনে করেন, দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও অটোমেশন বাড়লেও আন্তর্জাতিক সূচকে এর পূর্ণ প্রতিফলন ঘটছে না। তিনি বলেন, শুধু অবকাঠামো গড়লেই হবে না, বরং বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও ব্যবহার-দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি সেবার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবই বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

পরিসংখ্যান বলছে, দেশের প্রায় পুরো জনসংখ্যা ফোর-জি নেটওয়ার্কের আওতায় থাকলেও ইন্টারনেট ব্যবহারের হার বেশ কম। আইটিইউর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ থ্রি-জি এবং ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ ফোর-জি নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছেন। তবে মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এছাড়া মাত্র ৫৫ দশমিক ১ শতাংশ পরিবারের বাড়িতে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

আইটিইউর সূচক অনুযায়ী, ‘অর্থবহ সংযোগ’ বা নেটওয়ার্কের মানে বাংলাদেশের স্কোর ৮৭ দশমিক ১ হলেও, ‘সর্বজনীন সংযোগ’ বা ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্কোর মাত্র ৫০ দশমিক ৬। বিশ্লেষকদের মতে, নেটওয়ার্কের আওতা বাড়লেও সাধারণ মানুষের জীবন, শিক্ষা ও ব্যবসায় এর ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি বড় ‘ইউসেজ গ্যাপ’ বা ব্যবহারের ফারাক তৈরি হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, ধীরে ধীরে স্কোর বাড়লেও এখন সময় এসেছে আইসিটি অবকাঠামোর মাধ্যমে অর্থনীতি সুদৃঢ় করা এবং নাগরিক সেবার মান বাড়িয়ে জীবনযাত্রার উন্নয়ন ঘটানোর। তিনি ডিজিটাল বৈষম্য কমিয়ে সব স্তরের মানুষকে এই অগ্রযাত্রায় যুক্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন। আইটিইউর প্রতিবেদনেও সর্বজনীন সংযোগ বৃদ্ধি, ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের বিস্তার এবং ডিজিটাল দক্ষতা ও সাইবার নিরাপত্তার বিষয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, বর্তমানে দেশের ৩৪ শতাংশ মানুষ ডিজিটাল লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।