স্বাধীনতা পরবর্তী ৫৫ বছরে বাংলাদেশে প্রেসিডেন্ট পদে ২২ বার পরিবর্তন এসেছে। এই দীর্ঘ সময়ে প্রেসিডেন্ট পদে আসা ব্যক্তিদের বেশির ভাগই ছিলেন রাজনীতিক, তবে এর মধ্যে দুজন সামরিক বাহিনী থেকে এবং কয়েকজন পেশাজীবীও দায়িত্ব পালন করেছেন। কেউ মেয়াদ শেষে স্বাভাবিকভাবে বিদায় নিয়েছেন, আবার কেউ অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সরে গেছেন। হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন দুজন প্রেসিডেন্ট। এই পদ ঘিরে নানা সময় নানা নাটকীয় ঘটনা ঘটেছে।

সর্বশেষ দেশের ২২তম প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন গতকাল শুক্রবার পদত্যাগ করেছেন। তিন বছর তিন মাস দায়িত্ব পালন শেষে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি এই পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। মো. সাহাবুদ্দিন একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি তিনটি ভিন্ন সরকারের মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন। শুক্রবার বিকালে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার মাধ্যমে তার বঙ্গভবন অধ্যায়ের ইতি ঘটে। নিয়ম অনুযায়ী, পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগ পর্যন্ত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদই প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন। মো. সাহাবুদ্দিন আগামী এক-দুদিনের মধ্যেই বঙ্গভবন ছেড়ে গুলশানের বাসায় উঠবেন বলে জানা গেছে।

মো. সাহাবুদ্দিনের বিদায় ঘিরে নানা আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। বিশেষ করে লন্ডন সফরের সময় ভারতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপের জেরে তার পদত্যাগ নিয়ে ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে। এছাড়া বিএনপি সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাস পর তার এই বিদায়ের পেছনে দলটির রাজনৈতিক কৌশলের বিষয় নিয়েও আলোচনা আছে। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে একটি ব্যবসায়িক গ্রুপের হস্তক্ষেপে সাহাবুদ্দিনকে প্রেসিডেন্ট করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই গ্রুপের প্রভাবেই তিনি ইসলামী ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী পর্যদে যুক্ত হয়েছিলেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার থাকাকালেও তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছিল এবং বর্তমানে তার অতীত নিয়ে তদন্তের দাবিও উঠেছে।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। শুরুতে প্রায় ২০ বছর দেশ চলেছে প্রেসিডেন্ট শাসিত ব্যবস্থায়। ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১২ই জানুয়ারি তিনি সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রেসিডেন্ট পদ ত্যাগ করেন। ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের পর তিনি পুনরায় প্রেসিডেন্ট শাসিত ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনেন এবং প্রেসিডেন্ট হন, তবে ওই বছরের ১৫ই আগস্ট তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল থেকে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি পর্যন্ত অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। এরপর ১২ই জানুয়ারি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন, যিনি ১৯৭৩ সালের শেষের দিকে পদত্যাগ করেন। এরপর মোহাম্মদ মোহাম্মদউল্লাহ অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট থেকে নির্বাচিত হয়ে ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোস্তাক আহমেদ প্রেসিডেন্ট হন।

১৯৭৫ সালের ৬ই নভেম্বর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম প্রেসিডেন্ট হন এবং ১৯৭৭ সালের ২১শে এপ্রিল পদত্যাগ করেন। এরপর মেজর জিয়াউর রহমান দায়িত্ব নেন এবং ১৯৭৮ সালের ২৩শে জুন সরাসরি নির্বাচনে জয়ী হন। ১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রামে তিনি নিহত হওয়ার পর বিচারপতি আবদুস সাত্তার দায়িত্ব নেন। ১৯৮২ সালের মার্চে লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন এবং ২৭শে মার্চ আহসান উদ্দিন চৌধুরীকে প্রেসিডেন্ট করেন। ১৯৮৩ সালে এরশাদের চাপে তিনি পদত্যাগ করলে এরশাদ নিজেই প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এরশাদের পতনের পর প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নেন এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন।

১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর পর প্রেসিডেন্ট পদের ক্ষমতা কমে যায়। ১৯৯১ সালের ৮ই অক্টোবর আবদুর রহমান বিশ্বাস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ২৩শে জুলাই শাহাবুদ্দিন আহমেদ পুনরায় প্রেসিডেন্ট হন। ২০০১ সালের ১৪ই নভেম্বর অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী দায়িত্ব নিলেও রাজনৈতিক মতবিরোধে ২০০২ সালের ২১শে জুন পদত্যাগ করেন। এরপর ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ২০০৬ সালের ২৯শে অক্টোবর থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেন। পরবর্তীতে জিল্লুর রহমান ২০০৯ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০১৩ সালে তার মৃত্যু হলে মোহাম্মদ আবদুল হামিদ প্রেসিডেন্ট হন। তিনি দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৩ সালের ২৪শে এপ্রিল মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন।