চলতি মাসে তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন শেষে দেশে ফেরার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তড়িঘড়ি উড়োজাহাজ পরিবর্তনের নেপথ্যে ছিল এক চাঞ্চল্যকর গোয়েন্দা তথ্য। ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ট্রাম্প ও তাঁর ব্যবহৃত বিমান লক্ষ্য করে আকাশে হামলা চালানোর ছক কষছিল—এমন একটি সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতেই তখন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এই স্পর্শকাতর তথ্যটি সামনে এনেছে। তুরস্কে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলন চলাকালেই মূলত এই সুনির্দিষ্ট হুমকির বিষয়টি সামনে আসে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প আঙ্কারা সফরে গিয়েছিলেন কাতার সরকারের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া একটি বিলাসবহুল বোয়িং ৭৪৭-৮ উড়োজাহাজে চড়ে। প্রায় ১৪ বছরের পুরোনো এই বিমানটিকে ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করতে বেশ তড়িঘড়ি ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। তবে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাতার থেকে পাওয়া এই নতুন উড়োজাহাজটিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিয়মিত ব্যবহৃত পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানের মতো অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষামূলক বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ছিল না। এই নিরাপত্তা ঘাটতির কথা জানতে পেরেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বিশেষ বাহিনী ‘সিক্রেট সার্ভিস’ ট্রাম্পকে অবিলম্বে উড়োজাহাজ পরিবর্তনের জোর পরামর্শ দেয়। পরে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ট্রাম্প নিজেই তাঁর পুরোনো বিমানে চড়ে তুরস্ক ছাড়ার ঘোষণা দেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও অবশ্য ১৯৯০ (1990) সাল থেকে ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকা পুরোনো উড়োজাহাজ দুটির অবস্থা নিয়ে বছরের পর বছর ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছিলেন।
শুরুতে অবশ্য ট্রাম্প উড়োজাহাজ বদলের পেছনে নিরাপত্তার বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, ব্রিটেনে অবস্থানরত মার্কিন সেনাসদস্যদের নতুন বিমানটি ঘুরে দেখার সুযোগ করে দিতেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে গত রোববার ট্রাম্প নিজেই পরোক্ষভাবে স্বীকার করেন যে নতুন কাতারি বিমানে পুরোনো বোয়িংয়ের মতো সব ধরনের আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ান বিমানটি সম্পূর্ণ নিরাপদ হলেও এর সুরক্ষাব্যবস্থা আরও জোরালো করতে আগামী শরতে প্রায় এক মাসের জন্য সেটিকে সেবার বাইরে রেখে আধুনিকায়ন করা হবে। এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ট্রাম্প তাঁর পুরোনো বিমানেই যাতায়াত করবেন।
মার্কিন গোয়েন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, ইরান-সমর্থিত প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বহনকারী বিমানটি আকাশে ধ্বংস করা। ইরান-সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্পকে হত্যার সুযোগ খুঁজছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তাঁর নির্দেশে ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর থেকেই এই শত্রুতার সূত্রপাত। এমনকি ট্রাম্পের মাথার দাম ১২৩ কোটি টাকাও ঘোষণা করা হয়েছিল। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নিজেও বলেন, "তারা আমাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চায়। আমি তাদের প্রতিটি হিটলিস্টে আছি।"
এদিকে সিক্রেট সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে তাঁদের সুরক্ষায় থাকা ব্যক্তিদের জন্য হুমকির মাত্রা ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংস্থার পরিচালক শন কারান তাঁর ২৪ বছরের ক্যারিয়ারে এমন অস্থির পরিস্থিতি আর দেখেননি বলে মন্তব্য করেন। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পেনসিলভানিয়ার বাটলার শহরে নির্বাচনী জনসভায় ট্রাম্প গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময়ও শন কারান তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। অন্যদিকে, নতুন বিমানের নিরাপত্তা ঘাটতির তথ্য ফাঁসের ঘটনা নিয়ে মার্কিন বিচার বিভাগ তদন্ত শুরু করেছিল এবং নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিকদের ফোন রেকর্ড চেয়ে নোটিশ পাঠিয়েছিল। তবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে গত বৃহস্পতিবার সেই নোটিশ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
উড়োজাহাজ বদলের ঘটনার সময় গুঞ্জন উঠেছিল যে ইসরায়েলও ট্রাম্পকে হত্যায় ইরানের তৎপরতার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করেছিল। তবে মার্কিন প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা বিষয়টিকে সন্দেহের চোখে দেখেছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, ট্রাম্প যেন ইরানের ওপর সামরিক হামলা জোরদার করেন, সেই উসকানি দিতেই ইসরায়েল এই চাল চেলেছে। তবে কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, তুরস্কে ট্রাম্পের বিমান লক্ষ্য করে হামলার যে সুনির্দিষ্ট হুমকি এসেছিল, তা ইসরায়েলি তথ্যের চেয়ে আলাদা ছিল। ট্রাম্প যখন আঙ্কারায় অবস্থান করছিলেন (যা তেহরান থেকে প্রায় ১ হাজার মাইল দূরে), ঠিক তখনই ইরানকে লক্ষ্য করে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।