ঝালকাঠি পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ব্যাপক অনিয়ম ও অভূতপূর্ব লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে দায়সারাভাবে কাজ শেষ করায় স্থানীয় নাগরিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। যেকোনো সময় এই ক্ষোভ গণআন্দোলনে রূপ নিতে পারে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সংগঠিত হচ্ছেন পৌরবাসী।

তথ্যমতে, পৌর এলাকায় খাল খনন, অবকাঠামো উন্নয়ন, ঝালকাঠি চত্বর ও নতুন গোরস্থান নির্মাণ, সড়ক সংস্কার, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং ফুটপাত নির্মাণের জন্য মোট ৬ কোটি ১৫ লাখ টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। তবে ঠিকাদারদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন বা পার্সেন্টিজ না দিলে কার্যাদেশ দেওয়া হতো না। এছাড়া মানবিক দান-অনুদান ও সহায়তা খাতের কয়েক লাখ টাকার সিংহভাগই আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সচেতন নাগরিকরা যাতে প্রকল্পের বরাদ্দ সম্পর্কে জানতে না পারেন, সেজন্য কোনো নামফলক বা ভিত্তিপ্রস্তরে বরাদ্দের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই পর্যন্ত ঝালকাঠি পৌরসভার প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (স্থানীয় সরকার ও সার্বিক) মো. কাওছার হোসেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর তৎকালীন জেলা প্রশাসক ফারাহ গুল নিঝুম ২৮ আগস্ট ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ৭টি খাল খনন কাজের উদ্বোধন করেন। কিন্তু ৬টি খালের খনন কাজ মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায় এবং ১টি খালের কাজ শুরুই করা যায়নি। অথচ কাজ অর্ধেকও না হওয়া সত্ত্বেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আজমিরী বিল্ডার্সকে ৭০ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করেছে পৌর কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে এই খালগুলো ময়লা-আবর্জনায় নর্দমায় পরিণত হয়ে মশার প্রজনন কেন্দ্রে রূপ নিয়েছে, যার ফলে এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা মনির হোসেন।

পৌরসভার অন্য একটি প্রকল্পে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩.৬ কিলোমিটার রাস্তা কার্পেটিং ও সিসি ঢালাই, ৮৫০ মিটার ড্রেন, ৫০০ মিটার ফুটপাত এবং ১১টি অবকাঠামো নির্মাণে ৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ইতিমধ্যে ২ কোটি ৫ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়াও জরুরি মেরামতের জন্য এডিবি প্রকল্পের ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং ২০ লাখ টাকা বরাদ্দে ৮৭৫ মিটার পিচঢালাই রাস্তার কাজ করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব বড় বড় কাজ জেলার বাইরের ঠিকাদারদের দেওয়া হয়েছে, যারা প্রশাসকের ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

কলেজ রোডের বাসিন্দা হুমায়ুন কবীর বাদল অভিযোগ করেন, ফায়ার সার্ভিস মোড় থেকে কলেজ মোড় পর্যন্ত কার্পেটিং শেষ হতে না হতেই আস্তর উঠে যাচ্ছে। জেলা স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ হাওলাদার বলেন, ৩ নম্বর কৃষ্ণকাঠি ওয়ার্ডের কবিরাজ বাড়ি রোডে ড্রেনের প্রয়োজন থাকলেও তা না করে বিলাসিতার প্রকল্প করা হয়েছে। জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মুবিনুল ইসলাম সাদ্দাম এবং স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম সুমন অভিযোগ করেন, সাবেক প্রশাসক কাওছার হোসেনের আমলে সিন্ডিকেটের বাইরে কোনো কাজ হয়নি। অতীতে যে রাস্তা ২ লাখ ৮০ হাজার টাকায় সংস্কার করা হয়েছিল, তা এবার ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে করা হয়েছে।

সুেশনের জন্য নাগরিক (সুজন) জেলা সম্পাদক ও টিআইবির সনাক সদস্য ইসমাঈল মুসাফির বলেন, ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকার কাজের অর্ধেকও না করে ৭০ লাখ টাকা তুলে নেওয়া স্পষ্ট অনিয়ম। নামফলকে বরাদ্দের তথ্য না রাখা নীতিগতভাবে অন্যায়। এ বিষয়ে সুজনের পক্ষ থেকে পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে এবং টিআইবির সনাক সভায় আলোচনা করে নিয়মতান্ত্রিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

অভিযোগের বিষয়ে ঝালকাঠি পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী টি. এম রেজাউল হক রিজভী জানান, খালের ৫৩ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হওয়ায় চলমান বিল দেওয়া হয়েছে। রাস্তার কার্পেটিং উঠে যাওয়ার বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আজমিরী বিল্ডার্সকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তবে সাবেক পৌর প্রশাসক মো. কাওছার হোসেনের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে এককোটি ৩৩ লাখ টাকা বরাদ্দে পৌর এলাকার ৭টি খাল খননের টেন্ডার দিয়ে ২৮ আগস্ট কাজ উদ্বোধন করেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক ফারাহ গুল নিঝুম।