প্রতিদিন সকালে দাঁত মাজার অভ্যাসের মাধ্যমেই অজান্তে আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক। বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) সম্প্রতি একটি গবেষণায় জানিয়েছে, দেশে বিক্রি হওয়া প্রতি চারটি টুথপেস্টের মধ্যে প্রায় তিনটিতেই এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা রয়েছে। গবেষণার জন্য আমদানি করা ও দেশে তৈরি ৩৪টি টুথপেস্ট পরীক্ষা করা হয়, যার মধ্যে ২৬টিতেই এই বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এমনকি শিশুদের জন্য তৈরি টুথপেস্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।
গবেষকরা জানান, বাংলাদেশের ২৫টি নমুনার মধ্যে ২২টিতে, ভারতের ৫টির মধ্যে ১টিতে, থাইল্যান্ডের ২টির মধ্যে ১টিতে এবং ভিয়েতনামের ২টির মধ্যে দুটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। একটি টুথপেস্টে প্রতি ১০০ গ্রামে ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৩২০টি কণা শনাক্ত হয়েছে। শিশুদের জন্য বিক্রি হওয়া ৬টি টুথপেস্টের মধ্যে ৪টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, যেখানে প্রতি ১০০ গ্রামে ২০ থেকে ১৪০টি কণা ছিল।
২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ২ হাজার ৭৬০ জন ভোক্তার ওপর জরিপ চালানো হয়। পাশাপাশি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ‘এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি (ইএইচই)’ ল্যাবরেটরিতে স্টিরিওমাইক্রোস্কোপি ও ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি (এফটিআইআর) প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই নমুনাগুলো পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, ৩৪টি নমুনার মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকলেও ৮টিতে এর উপস্থিতি নেই। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, পরীক্ষা করা কোনো টুথপেস্টের মোড়কেই মাইক্রোপ্লাস্টিক বা কৃত্রিম পলিমার ব্যবহারের তথ্য উল্লেখ ছিল না।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক ফুসফুসের প্রদাহ, কার্যক্ষমতা হ্রাস, অ্যাজমা ও সিওপিডির জন্য দায়ী। এছাড়া এটি অন্ত্রের প্রদাহ, উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করা, রক্তনালীর ক্ষতি এবং হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। মস্তিষ্কের স্নায়ু প্রদাহ এবং চিন্তাশক্তির সক্ষমতা হ্রাসেও এর ভূমিকা থাকতে পারে। দন্ত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মো. মোশাররফ হোসেন খন্দকার জানান, মাইক্রোপ্লাস্টিক দাঁত সাদা করলেও এর ঘর্ষণ ক্ষমতা দাঁতের এনামেলের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
জরিপে অংশ নেওয়া ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ জানতেনই না যে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকতে পারে। এসডোর চেয়ারপারসন সৈয়দ মারঘুব মোর্শেদ বলেন, এই প্রথম দেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা হলো, যা ভবিষ্যতে নীতিমালা প্রণয়নে সহায়তা করবে। এসডোর মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন পণ্যের লেবেলে উপাদানের স্পষ্ট উল্লেখের ওপর জোর দিয়েছেন।
বিএসটিআইয়ের উপ-পরিচালক মো. মনজুরুল করিম জানিয়েছেন, বর্তমানে অনুমোদিত ৪০টি উপাদানের তালিকায় মাইক্রোপ্লাস্টিক অন্তর্ভুক্ত নেই। তবে গবেষণার তথ্য সামনে আসার পর এসআরও সংশোধন করে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মানদণ্ড বা সহনশীল মাত্রা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসডো স্পষ্ট করেছে যে, এই গবেষণার উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডকে দায়ী করা নয়, বরং জাতীয় মানদণ্ড ও পরীক্ষার নির্দেশিকা তৈরির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা।
পরীক্ষায় আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি স্টিরিওমাইক্রোস্কোপি ও ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি (এফটিআইআর) ব্যবহার করা হয়। পরীক্ষা করা ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে (৭৬.৫ শতাংশ) মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, আর ৮টিতে (২৩.৫ শতাংশ) কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি।