বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে মামলা করতে গিয়ে উলটো পুলিশের করা মামলার আসামি হয়েছেন সোনিয়া আক্তার কেয়া নামে এক নারী। অভিযোগ রয়েছে, অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তাকে রাতভর মারধর করা হয়েছে এবং সরকারি কাজে বাধা ও পুলিশ সদস্যকে মারধরের অভিযোগ এনে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কারাবন্দি অবস্থায় শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে দুদিন কারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। রাজধানীর রামপুরা থানা পুলিশের এই কর্মকাণ্ডের সত্যতা যুগান্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, পূর্ব রামপুরার মমতাজ ভিলার ভাড়াটিয়া সোনিয়া আক্তার কেয়া গত ২৭ মে ঈদুল আজহার ছুটিতে গ্রামের বাড়ি দোহারে যান। বাড়িওয়ালার পীড়াপীড়িতে অনিচ্ছাসত্ত্বেও তিনি ফ্ল্যাটের চাবি রেখে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে তিনি দেখেন তার আলমারিতে রাখা স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা ও চেকবই চুরি হয়েছে। ৫ জুন এ নিয়ে বাড়িওয়ালা আলমগীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে রামপুরা থানায় গেলে পুলিশ তা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তীতে খিলগাঁও জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) তৌফিক আহমেদের হস্তক্ষেপে থানা পুলিশ লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করলেও তা মামলা হিসেবে রেকর্ড করেনি।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ৮ জুন রাতে পুনরায় মামলা করার অনুরোধ নিয়ে থানায় গেলে রামপুরা থানার ওসি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন তার কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ওসি তাকে অনৈতিক প্রস্তাব দেন এবং অশালীন মন্তব্য করেন। এর প্রতিবাদ করলে ওসি ও কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাকে মারধর করেন। সোনিয়া থানা থেকে বের হয়ে এসিকে বিষয়টি জানান এবং ফেসবুক লাইভে প্রচারের চেষ্টা করলে পুলিশ তার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলে। পরে ওসির গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বাধা দিলে তাকে ভেতরে নিয়ে ঘণ্টাব্যাপী মারধর করা হয়।

তদন্তের নথিতে পুলিশের দাবি, সোনিয়ার অভিযোগ আগেই মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি পুলিশের ওপর হামলা চালান। অথচ সিসিটিভি ফুটেজে পুলিশের বক্তব্যের অসংগতি পাওয়া গেছে। রাত ১২টার পর এসি তৌফিক আহমেদ থানায় পৌঁছালে সোনিয়াকে আবারও মারধর করে পুলিশের গাড়িতে তোলা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তাকে ওড়না দিয়ে চোখ বেঁধে খিলগাঁও থানায় নেওয়া হয় এবং পুরো পথেই মারধর করা হয়। সেখানে তার বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা ও পুলিশ সদস্যকে মারধরের মামলা দায়ের করা হয়।

পরদিন শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পুলিশ তাকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আদালতে পাঠায়। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, আঘাতের চিহ্ন ও ছেঁড়া কাপড় থাকা সত্ত্বেও তাকে বিচারকের সামনে হাজির না করে সরাসরি হাজতখানায় রাখা হয়। আদালতের নির্দেশে তাকে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়, যেখানে কারা কর্তৃপক্ষ তার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় দুদিন হাসপাতালে ভর্তি রাখে। সাতদিন কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান।

পুলিশের দাবি, সোনিয়ার আঘাতে নারী কনস্টেবল আরিফা সুলতানা আহত হয়ে মুগদা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু ৮ ও ৯ জুন মুগদা মেডিকেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের রেজিস্টারে ওই নামে কোনো রোগী ভর্তির তথ্য পাওয়া যায়নি। ওসি জাহাঙ্গীর হোসেন সিসিটিভি ফুটেজের কথা বললেও তা দেখাতে অস্বীকৃতি জানান। এছাড়া সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ ও ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী গ্রেফতারের ১২ ঘণ্টার মধ্যে পরিবারকে জানানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও সোনিয়ার ক্ষেত্রে তা করা হয়নি।

সোনিয়া একজন অভিনয়শিল্পী এবং ডিভোর্সি নারী, যিনি তার কলেজপড়ুয়া ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় থাকেন। ঘটনার সময় তার ছেলে ও মা থানায় এলেও পুলিশ তাদের ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। এসি তৌফিক আহমেদ জানান, ওসি আগেই মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। অন্যদিকে ডিএমপি মতিঝিল বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন-অর-রশিদ জানান, নারীর অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে। এ ঘটনায় সোনিয়া পুলিশ সদর দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাড়িওয়ালা আলমগীর সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, পূর্ব রামপুরার ২৪৮/৬/১ নম্বর মমতাজ ভিলার ভাড়াটিয়া সোনিয়া আক্তার কেয়া ২৭ মে ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে দোহারে গ্রামের বাড়ি যান। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফ্ল্যাটের চাবি রেখে যান বাড়িওয়ালার কাছে। কয়েকদিন পর ফিরে দেখেন আলমারিতে রাখা স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা ও চেকবই খোয়া গেছে। এ নিয়ে বাড়িওয়ালা আলমগীরের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হলে ৫ জুন তিনি রামপুরা থানায় অভিযোগ দিতে যান। কিন্তু অভিযোগ নিতে অস্বীকৃতি জানায় পুলিশ। পরদিন খিলগাঁও জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) তৌফিক আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি সোনিয়াকে বলেন, ‘ওসিকে বলে দিচ্ছি। মামলা নেবে।’ এরপর থানা পুলিশ লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করে। তবে মামলা হিসাবে রেকর্ড করা হয়নি।

আদালতে বিচারকের সামনে তাকে উপস্থাপন না করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিচারক আসামি দেখবেন নাকি দেখবেন না, সেটি আদালতের এখতিয়ার।’ পুলিশের ওপর হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ রয়েছে সোনিয়া ২-৩ জন পুলিশ সদস্যকে মারধর করেছেন। তবে তদন্তের সব নথি তার হাতে পৌঁছেনি।’