জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি ধরে রাখতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রায় দেড় দশকের আবাসস্থল গণভবনে তৈরি করা হয়েছে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’। আগামী ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই জাদুঘরটি উদ্বোধন করবেন। বর্তমানে সেখানে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চললেও জাদুঘরটির জন্য এখনো কোনো স্থায়ী জনবল নিয়োগ করা সম্ভব হয়নি।
জাদুঘরের জনবল সংকটের বিষয়ে এর মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব জানান, স্থায়ী জনবল নিয়োগ না হওয়ায় আপাতত জাতীয় জাদুঘরের ১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এখানে কাজ করছেন। এছাড়া আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমেও কিছু জনবল নিয়ে আপাতত জাদুঘরটির উদ্বোধন ও প্রাথমিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। নতুন পর্ষদ গঠিত হওয়ায় নিয়োগ সংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত কেটে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এর আগে গত ২৮ জানুয়ারি ৯৬ জনকে সরাসরি মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলে তা নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে সেই পরীক্ষা বাতিল করা হয়। উল্লেখ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর (কর্মকর্তা ও কর্মচারী) চাকরি প্রবিধানমালা ২০২৫ (2025) অনুযায়ী, বিভিন্ন পদে নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক।
১৯৭৩ (1973) সালে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও সচিবালয় হিসেবে শেরেবাংলা নগরে এই গণভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ১৭ দশমিক ৬৮ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত গণভবনটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। উত্তেজিত জনতা ভবনটিতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এরপর ৬ আগস্ট বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এর সুরক্ষার দায়িত্ব নেয়। ৫ সেপ্টেম্বর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার এটিকে জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ২৪ ডিসেম্বর উপদেষ্টা পরিষদের সভায় এর নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। গত বছরের ১৩ নভেম্বর এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারি এবং চলতি বছরের ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’ পাস হয়।
জাদুঘরটি নির্মাণে গণপূর্ত বিভাগ ও জাতীয় জাদুঘর যৌথভাবে ১২৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছিল। এর মধ্যে ১১০ কোটি ৯২ লাখ টাকা খরচ হয়েছে এবং অব্যয়িত ১২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা সরকারের কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে জাদুঘরটি পরিচালনার জন্য ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তর মূলত ক্ষতিগ্রস্ত মূল ভবনের সংস্কার ও বৈদ্যুতিক অবকাঠামোর কাজ করেছে। অন্যদিকে জাতীয় জাদুঘর গ্যালারি সাজানো, নিদর্শন সংগ্রহ, ভাস্কর্য ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ এবং আসবাবপত্র কেনার দায়িত্ব পালন করেছে।
এই জাদুঘরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের গুম ও নির্যাতনের ইতিহাসকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখানে ২২টি সেল দিয়ে প্রতীকী ‘আয়নাঘর’ তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া জুলাই আন্দোলন, শাপলা ট্র্যাজেডি এবং বিডিআর বিদ্রোহসহ বিভিন্ন সময়ে গুম ও খুনের শিকার প্রায় ৪ হাজার মানুষের নাম ও স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য মেমোরিয়াল ও আড়াই হাজারের বেশি ডামি কবর নির্মাণ করা হয়েছে। ১৯টি ভিন্ন থিমে তৈরি ৬২টি প্রামাণ্যচিত্র এবং মনসুন থিয়েটারে ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের ইতিহাস ও শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে জাদুঘরটির নির্মাণ প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু বিতর্কও তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজন দেখিয়ে গণ খাতে ক্রয় আইন, ২০০৬ (2006)-এর ৬৮ ধারা এবং গণ খাতে ক্রয়বিধি, ২০০৮ (2008)-এর ৭৬ (২) ধারা অনুযায়ী, সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কাজ বাস্তবায়নের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদনের পর এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। এছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার, ভাস্কর্য ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে অতিরিক্ত খরচ এবং অতিথিদের আপ্যায়ন বাবদ ৩৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকা ব্যয়ের অভিযোগ উঠে এসেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। এসব অভিযোগের বিপরীতে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ লিখিত প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব বলেছেন, সরকারি নিয়ম মেনেই সব কাজ হয়েছে, তবে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে কিছু প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
সম্প্রতি ৯ জুলাই সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীকে সভাপতি করে ১৫ সদস্যের নতুন জাদুঘর পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। এই পর্ষদের সদস্য এবং জুলাই আন্দোলনের শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ বলেন, vanished ফ্যাসিবাদী আমলের অত্যাচার ও অবিচারের ইতিহাস মানুষকে জানাতে জাদুঘরটি দ্রুত খুলে দেওয়া প্রয়োজন, যাতে সবাই জানতে পারেন দেশের জন্য কারা জীবন দিয়েছেন।